বনেদি পুজো

বনেদি পুজো

 

জনাইয়ের মুখোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজোয় আজও অটুট ঐতিহ্য, নিষ্ঠা ও পরম্পরা

 

তমাল মুখার্জী | রঙ নিউজ

 

জনাই, হুগলি: বাংলার দুর্গাপুজো মানেই শুধু উৎসব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন ঐতিহ্য, পারিবারিক ইতিহাস এবং ধর্মীয় রীতিনীতি। সেই বনেদিয়ানা ও ঐতিহ্যেরই এক উজ্জ্বল নিদর্শন হুগলি জেলার জনাই গ্রামের কমল মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির দুর্গাপুজো। প্রায় ২০০ বছরের কাছাকাছি প্রাচীন এই পুজো আজও নিজস্ব রীতিনীতি ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।

সম্প্রতি আমরা পৌঁছেছিলাম জনাইয়ের কমল মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির দুর্গাপুজোয়। আমাদের সঙ্গে ছিলেন ওই পরিবারের অন্যতম কর্মকর্তা শ্রীযুক্ত সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় মহাশয়। তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল এই প্রাচীন পুজোর ইতিহাস, বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাওয়া কিছু প্রথার কথা।

প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য

 

পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানা যায়, কমল মুখোপাধ্যায় মহাশয় এই দুর্গাপুজোর প্রতিষ্ঠাতা। প্রায় দুই শতাব্দীর কাছাকাছি সময় ধরে বংশপরম্পরায় এই পুজো চলে আসছে। পরিবারের ঐতিহ্য মেনে আজও এখানে নিষ্ঠার সঙ্গে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হয়।

 

এই বাড়ির দুর্গাপ্রতিমার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, দেবীর বাহন হিসেবে নরসিংহের উপস্থিতি। যা এই পরিবারের দুর্গাপুজোকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।

 

প্রতিপদ থেকেই শুরু হয় চণ্ডীপুজো ও ভোগ বিতরণ

 

এই বাড়িতে দুর্গাপুজোর বিশেষ রীতি হল, মহালয়ার পরদিন অর্থাৎ শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকেই মা চণ্ডীর পুজো ও ভোগ নিবেদন শুরু হয়। প্রতিপদ থেকে প্রতিদিন ভোগ নিবেদন করা হয় এবং সেই ভোগ প্রতিবেশীদের মধ্যেও বিতরণ করা হয়।

 

দশমীর দিন দেবীপ্রতিমার বিসর্জন হয়। সন্ধ্যাবেলায় সরস্বতী নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পুজোর সমাপ্তি ঘটে।

 

পশুবলি থেকে প্রতীকী বলি—সময়ের সঙ্গে বদলেছে প্রথা

 

একসময় এই বাড়ির দুর্গাপুজোয় নবমীর দিন দুটি পাঁঠা বলির প্রথা ছিল। একটি পাঁঠা বলি দেওয়া হতো গ্রামের একটি কালীমন্দিরের সামনে এবং অন্যটি বাড়ির পুজোমণ্ডপে দেবীর সামনে।

 

পরিবারের সদস্য সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ২০-২২ বছর আগে কালীমন্দিরের সামনে পাঁঠা বলি দেওয়ার সময় বাধার সৃষ্টি হয়। সেই সময় থেকেই ওই মন্দিরের সামনে বলির প্রথা বন্ধ হয়ে যায়।

অন্যদিকে, বাড়িতে পাঁঠা বলির প্রথাও প্রায় ছয়-সাত বছর আগে পরিবারের কয়েকজন ভাইয়ের উদ্যোগে বন্ধ করা হয়। এর পিছনে ছিল পশুবলির প্রতি তাঁদের অমানবিকতার অনুভূতি। পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্য করেছিলেন, বলির সময় অনেকেই মন্দির ছেড়ে চলে যেতেন। সেই উপলব্ধি থেকেই তাঁরা এই প্রথা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন।

 

বর্তমানে পশুবলির পরিবর্তে আখ, চালকুমড়ো প্রভৃতি সামগ্রী প্রতীকী বলি হিসেবে নিবেদন করা হয়। অর্থাৎ, প্রাচীন ঐতিহ্যকে বজায় রেখেই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুজোর রীতিতে এসেছে পরিবর্তন।

 

অষ্টমীতে কুমারীপুজো

 

এই বাড়ির দুর্গাপুজোর আর একটি উল্লেখযোগ্য প্রথা হল অষ্টমীর দিনে কুমারীপুজো। পরিবারের রীতি অনুযায়ী, এগারো বছরের কম বয়সি কুমারীকে দেবীজ্ঞানে পুজো করা হয়। এই আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেবীর মাতৃরূপ ও পবিত্রতার আরাধনা করা হয়।

ধুনো পোড়ানো: সধবা মহিলাদের বিশেষ আচার

 

মুখোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণীয় প্রথা হল ধুনো পোড়ানো। এই আচার পালনের জন্য বাড়ির সধবা মহিলারা দেবীর সামনে বসেন। তাঁদের দুই হাতে এবং মাথায় মাটির মালসা রাখা হয়। সেই মালসায় পাঠকাঠি রেখে ধুনো দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়।

 

অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ভক্তির সঙ্গে এই প্রথা পালন করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, তিনবার মালসা পরিবর্তন করে এই আচার সম্পন্ন করা হয়। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই রীতি আজও পুজোর অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ।

 

জন্মাষ্টমীতে ‘কাঠে ঘা’ প্রথা

 

প্রতিমা নির্মাণের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ পারিবারিক ঐতিহ্য। জন্মাষ্টমীর দিন পালিত হয় ‘কাঠে ঘা’ প্রথা। যে বাঁশ দিয়ে দুর্গাপ্রতিমার কাঠামো তৈরি করা হয়, সেই বাঁশের পুজো করার পর প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

এই বাড়ির প্রতিমা বংশপরম্পরায় একই শিল্পীরা তৈরি করে আসছেন। প্রতিমা তৈরির কাজও বাড়িতেই সম্পন্ন হয়। ফলে প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে পুজোর প্রতিটি আচারেই পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।

 

ঐতিহ্য ও পরিবর্তনের মেলবন্ধন

 

জনাইয়ের কমল মুখোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি পরিবারের প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির ধারক। প্রতিপদ থেকে ভোগ নিবেদন, অষ্টমীতে কুমারীপুজো, ধুনো পোড়ানো, জন্মাষ্টমীতে ‘কাঠে ঘা’ প্রথা এবং দশমীতে সরস্বতী নদীতে প্রতিমা বিসর্জন—সব মিলিয়ে এই পুজোর প্রতিটি পর্বেই রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

 

আবার পশুবলির পরিবর্তে আখ ও চালকুমড়োর মতো সামগ্রী দিয়ে প্রতীকী বলির প্রচলন প্রমাণ করে, ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়েও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনকে গ্রহণ করা সম্ভব।

বংশপরম্পরায় চলে আসা এই বনেদি দুর্গাপুজো আজও জনাইয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিষ্ঠা, পারিবারিক বন্ধন এবং প্রাচীন রীতিনীতির মেলবন্ধনে মুখোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গোৎসব ধরে রেখেছে তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *