রেখার আড়ালে মানুষের গল্প: প্রয়াত শিল্পী যোগেন চৌধুরী
দেবপ্রিয়া বারিক | সিনিয়র রিপোর্টার | রঙ নিউজ
কলকাতা: ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব যোগেন চৌধুরীর প্রয়াণে শিল্পজগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় শিল্পকলা হারাল এক স্বতন্ত্র শিল্পভাষার স্রষ্টাকে।
১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন যোগেন চৌধুরী। কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফ্টে শিল্পশিক্ষা এবং প্যারিসে উচ্চশিক্ষা তাঁর শিল্পীসত্তাকে সমৃদ্ধ করে। পরবর্তী সময়ে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে শিক্ষকতা এবং রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর ছবির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল রেখার অসাধারণ ব্যবহার। মানুষের মুখ, শরীরের ভাঁজ এবং অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে তিনি ফুটিয়ে তুলতেন জীবনের টানাপোড়েন, মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক বাস্তবতা। কালি-কলম, জলরং ও প্যাস্টেলের মতো বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর কাজ ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলায় স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছে।
শিল্পের পরিসরের বাইরেও যোগেন চৌধুরীর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০১৪ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হন এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। শিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচিতি অক্ষুণ্ণ রেখেই তিনি জনজীবনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

তাঁর প্রাপ্ত সম্মানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯৬৬ সালের প্যারিসের Prix Le France de la Jeune Peinture এবং ২০০১ সালের কালিদাস সম্মান। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ২০১২ সালে বঙ্গবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। এই স্বীকৃতিগুলি তাঁর দীর্ঘ শিল্পসাধনার বিস্তৃত স্বীকৃতির অংশ।
তবে শিল্পীর কৃতিত্বকে শুধু পুরস্কার, পদ বা প্রদর্শনীর তালিকায় সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। তাঁর কাজের গুরুত্ব নিহিত রয়েছে সেই স্বতন্ত্র ভাষায়।

যোগেন চৌধুরীর শিল্প আমাদের শেখায়, ছবি শুধু চোখে দেখার বিষয় নয়—অনুভবেরও ভাষা। শিল্পীর শারীরিক অনুপস্থিতি তাঁর সৃষ্টির শক্তিকে মুছে দিতে পারে না। তাঁর রেখায় ধরা মানুষের গল্প আগামী প্রজন্মের শিল্পী ও দর্শকদের অনুপ্রাণিত করবে।

