আজ আমেরিকার মিড-টার্ম নির্বাচন ক্ষমতা কি একই দিকে থাকবে?

আজ আমেরিকার মিড-টার্ম নির্বাচন ক্ষমতা কি একই দিকে থাকবে?
অমিত গোস্বামী , রঙ নিউজ

আজ আমেরিকায় মিড-টার্ম নির্বাচন চলছেঃ

আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের বহুল প্রতীক্ষিত মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি নাকি বিরোধী ডেমোক্র্যাট পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেবে, তা নির্ধারিত হবে।
এখানকার পার্লামেন্ট অর্থাৎ কংগ্রেস -এর দুটি কক্ষ অর্থাৎ একটি কক্ষ হাউজ অফ রিপ্রেসেন্টেটিভ যার সদস্যদের মেয়াদ ২ বৎসর সেখানে ৪৩৫ টি আসনেই নির্বাচন হচ্ছে। অন্য কক্ষ হল সেনেট। সেখানে সদস্যদের মেয়াদ ৬ বৎসর, তবে প্রতি ২ বৎসর অন্তর ৩৩ জনকে নির্বাচিত হতে হয়। অর্থাৎ একসাথে সেনেট খালি হয় না। ২ বৎসর বাদে বাদে ৩৩ জনের মেয়াদ শেষ হয়। সেই আসনে নির্বাচন হয়। এবারে সেনেটে ৩৩+২ অর্থাৎ ৩৫ আসনে নির্বাচন হচ্ছে। ২ টি আসন অতিরিক্ত কেন?
১. ওহাইও (Ohio) অঙ্গরাজ্যের নির্বাচিত সিনেটর জেডি ভ্যান্স ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় সিনেটরের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার মেয়াদের বাকি অংশ পূরণ করতেই এই বিশেষ নির্বাচন হচ্ছে।
২. ফ্লোরিডা (Florida) অঙ্গরাজ্যের সিনেটর মার্কো রুবিও ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় সিনেট পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ফলে এই আসনটিতেও বিশেষ নির্বাচন দিতে হয়েছে।

কী ফলাফল আন্দাজ করছেন মার্কিন পন্ডিতরা?

দেখুন, হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভের নির্বাচনে এগিয়ে আছে ডেমক্র্যাটরা।ইকোনমিস্ট/ইউগভ জরিপে কংগ্রেসের ভোটাভুটির পছন্দে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের চেয়ে প্রায় ৭ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে আছে। তবে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হবে নিউ ইয়র্ক, পেনসিলভেনিয়া, ভার্জিনিয়া এবং ক্যালিফোর্নিয়ার শহরতলি এলাকায়। এখানে যারা জিতবে তারা গরিষ্ঠতা পাবে। কিন্তু আসল গুরুত্ব তো সেনেটের নির্বাচনে। এবারের নির্বাচনে যে ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে, তার মধ্যে ২২টি আসন রিপাবলিকানদের এবং ১৩টি আসন ডেমোক্র্যাটদের ছিল। তাহলে থেকে যাচ্ছে –
ডেমোক্র্যাট: ৪৭ – ১৩ = ৩৪টি আসন এবং রিপাবলিকান: ৫৩ – ২২ = ৩১টি আসন।
আমেরিকান সংবিধানে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে দুই কক্ষেরই সমান সম্মতি প্রয়োজন হলেও, ক্ষমতা ও দায়িত্বের দিক থেকে অনেক বেশি ক্ষমতাবান সেনেট। যেমন রাজস্ব ও কর সংক্রান্ত সকল বিল হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ কক্ষে উত্থাপিত হলেও পাস বা অনুমোদন হয় সেনেটে। কর্মকর্তাদের নিয়োগ অনুমোদনে হাউসের কোনো ভূমিকা নেই। আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনে হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ-এর কোনো এখতিয়ার নেই। আরও আছে। তবে এই নির্বাচনের পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের কথা শুনে চলতে বাধ্য হবেন যদি ডেমোক্র্যাটরা সেনেটে ১৭ বা ১৮ আসন ও হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ কক্ষে ২২০ টি আসন পায়।

হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ও নির্ণায়ক আসনগুলিঃ

এবার দেখা যাক সেনেট নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই কোথায় কোথায় হচ্ছে?
১) টেক্সাস : এই আসন রিপাবলিকান ঘাঁটি ছিল। এবারে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী জেমস তালারিকো এবং রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। CBS News-এর জরিপ অনুযায়ী তালারিকো ৫১% এবং প্যাক্সটন ৪৯% সমর্থন পেয়েছেন, আবার কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের জরিপে তালারিকো ৪৯% ও প্যাক্সটন ৪৪% সমর্থন নিয়ে এগিয়ে রয়েছেন।
২) ওহাইও :এখানে আগের বার জিতেছিলেন জে ডি ভ্যান্স। এবার রিপাবলিকান দলের হয়ে লড়ছেন জন হাস্টেড এবং উল্টোদিকে সাবেক ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর শেরড ব্রাউন। লড়াই অত্যন্ত তীব্র। Forbes-এ প্রকাশিত বিভিন্ন জরিপে ব্রাউন হাস্টেডের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন (কুক জরিপে ব্রাউন ৪৯% বনাম হাস্টেড ৪৩%; বোলিং গ্রিন/ইউগভ জরিপে ব্রাউন ৪৮% বনাম হাস্টেড ৪২%)।
৩) আইওয়া : এই আসনে ডেমোক্র্যাট জোশ টুরেক ও রিপাবলিকান অ্যাশলি হিনসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। ম্যারিস্ট পোল অনুযায়ী টুরেক ৪৮% এবং হিনসন ৪৫% সমর্থন পেয়েছেন।
৪) মিশিগান : এই আসনে ডেমোক্র্যাট আব্দুল এল-সায়েদ এবং রিপাবলিকান মাইক রজার্স প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফক্স নিউজের জরিপে এল-সায়েদ ৫০% এবং রজার্স ৪৯% ভোট নিয়ে খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছেন।
৫) মেইন : বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসনের শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। সাফোক ইউনিভার্সিটির জরিপে জ্যাকসন ৪৯% ও কলিন্স ৪৭% ভোট পেয়েছেন।
৬) জর্জিয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনা (Georgia & North Carolina): জর্জিয়ায় আটলান্টা জার্নাল-কনস্টিটিউশন জরিপে বর্তমান ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জন ওসফ (৪৮%) রিপাবলিকান মাইক কলিন্সের (৪০%) চেয়ে এগিয়ে আছেন। নর্থ ক্যারোলাইনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার (৫২%) রিপাবলিকান মাইকেল হোয়াটলিকে (৩৯%) পেছনে ফেলেছেন।

ডেমোক্র্যাটরা জিতলে কী হতে পারে?

এই ৭ টি আসন নির্ণায়ক হয়ে উঠতে চলেছে। এই ৭ টি আসনের ৫ টিও যদি ডেমোক্র্যাটরা জেতে তাহলে ভোটকুশলীদের আন্দাজ সেনেটেও সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাবে ডেমোক্র্যাটরা। তাতে সরকার পাল্টাবে না। কিন্তু বর্তমান শাসক দল ও প্রেসিডেন্ট – ভাইস প্রেসিডেন্ট ‘সিটিং ডাক’ হয়ে থাকবেন। অর্থাৎ বিরোধীদের সাহায্য ছাড়া কোন বিলকে আইনে পরিণত করতে পারবে না, ইচ্ছে মত শুল্ক চাপানো বা যুদ্ধ চালু করা যাবে না। তদন্ত কমিটিগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে আসবে ডেমক্র্যাটদের হাতে। ডেমোক্র্যাটরা গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেসীয় কমিটিগুলোর (যেমন হাউস ওভারসাইট কমিটি, জুডিশিয়ারি কমিটি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাবেন। প্রশাসনিক জবাবদিহি চাওয়া বা আনুষ্ঠানিক শুনানি বা তদন্ত শুরু করার ক্ষমতা থাকবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। ফেডারেল সরকারের বাজেট বা ঋণসীমা পাসের ক্ষমতা হাউসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ডেমোক্র্যাটরা বাজেট পাসের বিনিময়ে সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশ তহবিলের বরাদ্দ রক্ষার শর্ত জুড়ে দিতে পারে, যা সরকারে অচলাবস্থা তৈরির ঝুঁকি বাড়াবে। যদি সিনেট ডেমোক্র্যাটরা পায় তবে বিচার বিভাগীয় ও নির্বাহী নিয়োগে নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে। বিচারক ও রাষ্ট্রদূত নিয়োগে বড় ভূমিকা তারাই নেবে। এককথায় ডেমোক্র্যাটদের কথার বাইরে প্রেসিডেন্ট বড় কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।

এই ফলে ভারত বা ভারতীয়দের কী যায় আসে?

ভারত বা ভারতীয়দের এই নির্বাচনের ফলাফলে কোন লাভ হবে কি?
১) রিপাবলিকানরা ঐতিহ্যগতভাবেই চীনের বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান নেয়। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বেইজিংয়ের আগ্রাসী মনোভাব রোধে ভারতকে প্রধান কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে রিপাবলিকান কংগ্রেস ও প্রশাসন বেশ ইতিবাচক থাকে। ভারতের আভ্যন্তরীন রাজনীতি নিয়ে নাক গলায় না।
তবে রিপাবলিকানদের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ অর্থনৈতিক নীতি এবং একতরফা শুল্ক আরোপের প্রবণতা ভারতের রপ্তানি খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এইচ-১বি ও আইনি অভিবাসন সংকোচন অর্থাৎ এইচ-১বি ভিসা ও গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া কঠোর করবে।
২) ডেমোক্র্যাটরা সাধারণত দক্ষ শ্রম অভিবাসন এবং শিক্ষার্থীদের ভিসা ব্যবস্থার প্রতি তুলনামূলক উদার মনোভাব পোষণ করত। এরপরে কী করবে তা স্পষ্ট নয়। তারা আকস্মিক শুল্ক বৃদ্ধির পরিবর্তে ডেমোক্র্যাটরা প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মমাফিক বাণিজ্যিক সম্পর্কে জোর দেয়।
তবে ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতারা প্রায়শই ভারতের বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার, নাগরিকত্ব আইন বা ধর্মীয় সহনশীলতার বিষয়ে কংগ্রেসে শুনানি ও সমালোচনা তুলতে আগ্রহী থাকেন। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করায় ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।

শেষের বাণীঃ

এককথায় ডেমোক্র্যাটদের অভিবাসন ও বহুপাক্ষিক নীতি ভারতীয় প্রযুক্তি ক্ষেত্র এবং প্রবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য তুলনামূলক অনুকূল হলেও রিপাবলিকানদের চীনবিরোধী নীতি ও প্রতিরক্ষা সমীকরণ ভারতের কৌশলগত অবস্থানের সাথে দ্রুত খাপ খায়। তবে ভারত আমেরিকা সম্পর্ক পুরো চাণক্য নীতিতে চলে। এখানে ভারতের পাওয়ার বা হারানোর খুব একটা কিছু নেই। যাই হোক ১২/১৪ ঘন্টা পর থেকেই ফলঘোষনা হবে। তখন এই অকিঞ্চিৎকর কলমচি’র কথা মেলাবেন যদি আপনার আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আমেরিকার নির্বাচনী ফলাফলের প্রতি আগ্রহ থাকে।
#america #USElection #republican #Trump #democracy #elections #electionnews

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *