আলামোহন দাশ ও দাশনগর
✍🏾সোমনাথ মুখোপাধ্যায়:Rong News
কে বলে বাঙালি উদ্যোগী নয় বা তার উদ্যোগপতি হওয়ার ইচ্ছা, ক্ষমতা কোনোওটাই নেই! আজ থেকে ১৩১ বছর আগে ১৮৯৫ সালে হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরের অন্তর্গত প্রত্যন্ত গ্রাম খিলা বড়ুইপুরে জন্ম নেওয়া নিম্নবিত্ত পরিবারের এক সন্তান দেখিয়ে দিয়েছিলেন সততা, নিষ্ঠা, হার না মানা অদম্য জেদ সম্বল করে সফল উদ্যোগপতি হওয়া যায়। উদাহরণ সৃষ্টি করা যায় অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার পাশাপাশি সংকটময় পরিস্থিতিতে মানুষের পাশে থাকার দৃঢ়চেতা অঙ্গীকার। তিনি আলামোহন দাশ। শুধুমাত্র যাঁর নামেই গড়ে ওঠে আস্ত একটি শিল্পনগরী দাশনগর!

দক্ষিণ পূর্ব রেলের হাওড়া খড়গপুর শাখার গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন হাওড়ার দাশনগর। প্রাচ্যের শেফিল্ড বলে পরিচিত শিল্পনগরী হাওড়ার অন্যতম প্রধান অঞ্চল দাশনগর গড়ে ওঠে আলামোহন দাশের হাত ধরে। পিতৃদত্ত নাম সুরেন্দ্রমোহন। জন্মেই কঠিন রোগের মুখে পড়ে মৃতপ্রায় হন শিশু সুরেন্দ্রমোহন। সকলকে অবাক করে আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসেন তিনি। এলিয়ে থাকার ফলে নাম হয় ‘অ্যালা’ ছেলে। অ্যালা থেকে আলামোহন। পরিবারের আর্থিক অনটন মেটাতে পড়ার বই তুলে রেখে মাত্র ১২ বছর বয়স থেকে মায়ের হাতে ভাজা মুড়ি ঘরে ঘরে বিক্রি করতে শুরু করেন আলামোহন। ক্রমে গ্রামের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে হাওড়া শহরের পথে পথে। সেখান থেকে গঙ্গা পেরিয়ে শহর কলকাতার অলিতে গলিতে দিনভর চলত মুড়ি বিক্রি। মুড়ি বিক্রি করতে গিয়ে বড়োলোক বাড়িতে ঘাড়ধাক্কা খেতে হয়েছে তাঁকে। তাতে দমেননি তিনি। মুড়ি বিক্রির লাভের অংশকে মূলধন করে খাদ্য শস্যের দোকান খোলেন হাওড়ায়। সেখান থেকে তৈরি করে ফেলেন কেমিক্যাল কারখানা। বাকিটা ইতিহাস। ১৯৩০ সালে ছাপাখানার যন্ত্র, কাপড় তৈরির যন্ত্র, ওজনের যন্ত্র তৈরি করতে গড়ে তোলেন ইন্ডিয়ান মেশিনারি। নিয়োগ করেন কর্মচারী। সৃষ্টি হয় কর্মসংস্থান। এরপর একে একে ১৯৩৭ সালে ভারত জুট মিল, চিনির কারখানা দাশ সুগার কোম্পানি, গ্রেট ইন্ডিয়ান স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি, আরতি কটন মিল, ১৯৪২ সালে ওষুধ কারখানা এশিয়া ড্রাগ কোম্পানি। বিমা ব্যবসাতেও আসেন আলামোহন। ১৯৪১ সালে খোলেন দাশ ইন্সিওরেন্স কোম্পানি। তৈরি করেন ১৪টি শাখাযুক্ত ব্যাঙ্ক যার প্রধান দপ্তর ছিল দাশনগরে। ততদিনে তিনি রীতিমতো বিজনেস টাইকুন। পেলেন কর্মবীর সম্মাননা। থামলেন না আলামোহন। তাঁর জীবনের লক্ষ্য যে চরৈবেতি! মহামারী কালাজ্বরের ওষুধ আবিষ্কার করেন ডাক্তার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী। সেটি সাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজন উপযুক্ত প্যাকিং। এগিয়ে এলেন আলামোহন। তাঁর কারখানায় তৈরি ফয়েল স্ট্রিপে প্যাকিং হওয়া ওষুধ পৌঁছে গেল ঘরে ঘরে। নাগরিক সম্মাননা অনুষ্ঠানে আনন্দে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন ডাক্তার ব্রহ্মচারী। একদিন তাঁর বাড়িতেই মুড়ি বিক্রির অপরাধে ঘাড়ধাক্কা খেতে হয় আলামোহন দাশকে!
মানুষের পাশে থেকে আরও কাজ করার ইচ্ছায় নির্বাচনে অংশ নেন আলামোহন। ১৯৫১ সালে হাওড়া জেলার আমতা বিধানসভা থেকে নির্দল প্রার্থী হিসাবে জয়ী হন তিনি। ১৯৬৯ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন কর্মে যুক্ত থেকে বাংলা তথা বাঙালির মননে ও তাঁর প্রিয় দাশনগরকে ঘিরে উজ্জ্বল জ্যোতিস্ক হয়ে রয়ে গিয়েছেন আলামোহন দাশ। বস্তুত আলামোহন দাশ ও দাশনগর এক ও অভিন্ন! দাশনগরের মোড়ে ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত তাঁর মূর্তি সাক্ষ্য দিয়ে চলেছে আজও।।

