“বরফের দেশে ঢাকের বোল, ফিনল্যান্ডের জীবন্ত ঐতিহ্যে দুর্গাপুজো”
প্রবাসের মাটিতে বাঙালির সংস্কৃতির এক অনন্য স্বীকৃতি
সাংবাদিক – দিব্যেন্দু দাস, এডিটর, রঙ নিউজ
একদিকে দীর্ঘ শীত, তুষারে ঢাকা ইউরোপের দেশ। অন্যদিকে শরতের আকাশ, কাশফুল আর ঢাকের আওয়াজের স্মৃতি। ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক, বাঙালির দুর্গাপুজো যে সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে নতুন ভূখণ্ডেও শিকড় গাড়তে পারে, তারই অনন্য উদাহরণ ফিনল্যান্ড।
ফিনল্যান্ডে পালিত ভারতীয় দুর্গাপুজো ২০২৬ সালে দেশটির National Inventory of Living Heritage বা জাতীয় জীবন্ত ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রকের ঘোষণায় নতুন ২২টি ঐতিহ্যের সঙ্গে এই দুর্গাপুজোকেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
এটি UNESCO World Heritage-এর স্বীকৃতি নয়; বরং ফিনল্যান্ডের জাতীয় পর্যায়ে জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সরকারি স্বীকৃতি। এই তালিকায় সাধারণত এমন ঐতিহ্য স্থান পায়, যা কোনও সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন বা সামাজিক জীবনে চর্চিত হয় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করা হয়।
১৯৯৯-এর ছোট্ট উদ্যোগ থেকে আজকের স্বীকৃতি
ফিনল্যান্ডে দুর্গাপুজোর গল্প খুব পুরনো নয়। ১৯৯৯ সালে হেলসিঙ্কিতে বসবাসকারী কয়েকজন বাঙালির উদ্যোগে শুরু হয় দুর্গাপুজো। সেই সময় আয়োজন ছিল ছোট, পরিসর ছিল সীমিত। প্রতিমার পরিবর্তে দুর্গার ছবি ব্যবহার করেই পুজো করা হয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ছোট্ট উদ্যোগের পরিধি বাড়ে। ২০০৩ সালে কলকাতা থেকে দুর্গাপ্রতিমা ফিনল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। ধীরে ধীরে পুজো হয়ে ওঠে প্রবাসী ভারতীয় ও বাঙালি সম্প্রদায়ের মিলনক্ষেত্র।
অর্থাৎ, এটি কেবল একটি পুজোর ইতিহাস নয়—এটি প্রবাসে একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধরে রাখার দীর্ঘ যাত্রা।
পুজো যেখানে সংস্কৃতির পাঠশালা-
ফিনল্যান্ডের দুর্গাপুজোর বিশেষত্ব এখানেই যে, এর পরিসর কেবল ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ নয়।
পুজোকে ঘিরে অনুষ্ঠিত হয় বাংলা গান, নাচ, আবৃত্তি, শিশুদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী খাবার, বাঙালি পোশাক, হস্তশিল্প এবং নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড। ফলে দুর্গাপুজো সেখানে একই সঙ্গে ধর্মীয় উৎসব, সামাজিক মিলনমেলা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় বহনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে প্রবাসে জন্ম নেওয়া শিশুদের কাছে এই উৎসব বাংলা ভাষা, গান, খাবার, পোশাক ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে।
নতুন প্রজন্মের হাতে ঐতিহ্যের মশাল-
জীবন্ত ঐতিহ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল—এটি শুধু অতীতকে স্মরণ করে না, ভবিষ্যতের কাছেও নিজেকে পৌঁছে দেয়।
ফিনল্যান্ডের দুর্গাপুজোতেও সেই ধারাটিই দেখা যায়। প্রবীণ প্রজন্ম যেখানে নিজেদের শিকড়ের স্মৃতি নিয়ে আসে, সেখানে নতুন প্রজন্ম সেই সংস্কৃতিকে নিজেদের পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে ধারণ করছে।
ফলে ফিনল্যান্ডে দুর্গাপুজো হয়ে উঠেছে বাংলার ঐতিহ্য ও ফিনল্যান্ডের বহুসাংস্কৃতিক সমাজের এক মিলনস্থল।
Bengali Association of Finland-এর ভূমিকা-
এই সাংস্কৃতিক ধারাকে সংগঠিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে Bengali Association of Finland (BAF) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে দুর্গাপুজো অন্যতম প্রধান বার্ষিক অনুষ্ঠান।
পুজোর আয়োজনের মাধ্যমে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বাঙালি সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগও তুলে ধরা হয়। স্থানীয় মানুষ এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
প্রতিমা থেকে জাদুঘর—ঐতিহ্যের আরও এক অধ্যায়-
ফিনল্যান্ডে দুর্গাপুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক স্মারক। ২০০৩ সালে কলকাতা থেকে নিয়ে যাওয়া দুর্গাপ্রতিমাটি পরবর্তী সময়ে সংরক্ষণ করা হয় এবং বর্তমানে সেটি Espoo-র একটি জাদুঘরের সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত।
অর্থাৎ, যে প্রতিমাকে কেন্দ্র করে একসময় প্রবাসে পুজোর সূচনা হয়েছিল, সেটিই আজ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি নিদর্শন।
শুধু বাঙালির নয়, বহুসাংস্কৃতিক ফিনল্যান্ডেরও গল্প-
দুর্গাপুজো ফিনল্যান্ডের জাতীয় জীবন্ত ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পাওয়ার ঘটনাকে শুধু প্রবাসী বাঙালির সাফল্য হিসেবে দেখলে গল্পটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
এটি একই সঙ্গে দেখায়, কীভাবে একটি দেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে অভিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ধীরে ধীরে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
১৯৯৯ সালে কয়েকজন মানুষের উদ্যোগে শুরু হওয়া একটি ছোট্ট অনুষ্ঠান আজ সরকারি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। পথটি তাই নিছক একটি পুজোর পথ নয়—এটি স্মৃতি, পরিচয়, সংস্কৃতি এবং প্রজন্মান্তরের ধারাবাহিকতার গল্প।
বরফের দেশে বাংলার শরৎ-
কলকাতা থেকে হেলসিঙ্কির দূরত্ব হাজার হাজার কিলোমিটার। তবু শরৎ এলেই কোথাও না কোথাও বাজে ঢাক। মণ্ডপে জ্বলে ওঠে আলো। উচ্চারিত হয় মন্ত্র। শিশুরা পরে নতুন পোশাক। ভাগ হয় ভোগের খাবার। আর প্রবাসী বাঙালির মনে ফিরে আসে বাংলার পুজোর স্মৃতি।
ফিনল্যান্ডের জাতীয় জীবন্ত ঐতিহ্যের তালিকায় দুর্গাপুজোর অন্তর্ভুক্তি সেই স্মৃতিকেই যেন একটি সরকারি সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি দিল।
বাংলার দুর্গাপুজো তাই শুধু বাংলায় নেই—তার ঢাকের বোল এখন উত্তর ইউরোপের মাটিতেও শোনা যায়।
