২২শে শ্রাবণ— রবি-বিদায়ের অন্ধকার দিক

২২শে শ্রাবণ— রবি-বিদায়ের অন্ধকার দিক

 

— অর্ঘ্য খামারু, রঙ নিউজ

 

নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা : শ্রাবণ মানেই বাঙালির কাছে বৃষ্টি, বিষণ্ণতা আর রবীন্দ্রস্মৃতি। কিন্তু ২২শে শ্রাবণ শুধু কবিগুরুর প্রয়াণের দিন নয়—এটি কলকাতার ইতিহাসের এমন এক দিন, যার স্মৃতিতে যেমন আছে অগণিত মানুষের ভালোবাসা, তেমনই আছে উন্মত্ত জনতার আচরণের এক কালো অধ্যায়।

 

১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২শে শ্রাবণ, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে দুপুর ১২টা ১০ মিনিট নাগাদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। দীর্ঘ অসুস্থতার পর আশি বছরের কবির জীবনাবসানের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই কলকাতা যেন হঠাৎ থমকে গেল।

 

শোক দ্রুত রূপ নিল অভূতপূর্ব জনসমাগমে। ঠাকুরবাড়ি থেকে জোরপূর্বক যখন কবির শবদেহ শেষযাত্রায় বেরোল, তখন রাস্তায় মানুষের ঢল। সমকালীন স্মৃতিচারণে রানি চন্দ লিখেছেন, জনসমুদ্রের উপর দিয়ে যেন ফুলে সাজানো এক নৌকা ভেসে চলে গেল। সেই ভিড় ক্রমশ এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে কবির পার্থিব দেহকে ঘিরে শ্রদ্ধা ও উন্মাদনার সীমারেখা মুছে যেতে থাকে।

 

সবচেয়ে মর্মান্তিক বিবরণগুলির অন্যতম —কিছু মানুষ কবির চুল, দাড়ি এমনকি নখও স্মারক হিসেবে সংগ্রহ করার জন্য ছিঁড়ে নিয়েছিল বলে পরবর্তী স্মৃতিকথা ও সংবাদ-নিবন্ধে উল্লেখ রয়েছে। প্রণামের অছিলায় তাঁর পায়ের নখ তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। আজকের চোখে এই ঘটনা নিছক ভক্তি নয়; বরং শোক যখন নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন শ্রদ্ধাও কীভাবে অসংযত আচরণে পরিণত হতে পারে, তার এক বেদনাদায়ক উদাহরণ।

 

আরও করুণ ছিল কবির শেষকৃত্যের ঘটনা।

 

রবীন্দ্রনাথের একমাত্র জীবিত পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন পিতার শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার জন্য আসছিলেন। কিন্তু নিমতলার পথে মানুষের এমন স্রোত জমেছিল যে তিনি স্থলপথে শ্মশানে পৌঁছতে পারেননি। ফলে পিতার মুখাগ্নি করার সুযোগও তাঁর হয়নি। একাধিক বিবরণ অনুযায়ী, কবির মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র সুবীরেন্দ্রনাথ ঠাকুর নদীপথে নিমতলায় পৌঁছে মুখাগ্নি করেন।

 

ভাবতে অবাক লাগে—যে মানুষটি সারাজীবন মানুষের মর্যাদা, সংযম, সৌন্দর্য ও মানবিকতার কথা বলেছেন, তাঁর নিজের শেষযাত্রাতেই মানুষের আবেগ কখনও কখনও সেই সংযম হারিয়েছিল। কবির দেহকে ঘিরে মানুষের ভালোবাসা ছিল নিঃসন্দেহে অসীম; কিন্তু সেই ভালোবাসার মধ্যেই যখন কেউ মৃত কবির চুল-দাড়ি ছিঁড়ে স্মারক সংগ্রহ করে, তখন সেই দৃশ্য শ্রদ্ধার চেয়ে আমাদের সভ্যতার আত্মসমালোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

 

তবু সেই ভিড়ের অন্য একটি দিকও ছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ সেদিন কবিকে শেষবার দেখার জন্য রাস্তায় নেমেছিল। নিমতলা ঘাটের চারপাশ, বাড়ির ছাদ, গাছের ডাল, নদীর পাড় এবং নৌকা—সবই মানুষের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে। রাতের দিকে সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য।

 

কবিগুরু বরাবরই শান্তিনিকেতনে প্রকৃতির কোলে মৃত্যুবরণ করতে চেয়েছিলেন, তবে তা অপূর্ণই থেকে যায়।

 

বিশ্বকবি চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর শেষযাত্রা আমাদের সামনে রেখে গেল দুটি বিপরীত ছবি—একদিকে একজন মহাকবিকে শেষবার দেখার জন্য মানুষের সীমাহীন ভালোবাসা, অন্যদিকে সেই ভালোবাসারই উন্মত্ত ও অমানবিক প্রকাশ।

 

আজ ২২শে শ্রাবণে শুধু রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে বা তাঁর প্রতিকৃতিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো যথেষ্ট নয়। তাঁর জীবন আমাদের যে সংযম, মানবিকতা ও মনুষ্যত্বের শিক্ষা দিয়েছে, তা মনে রাখাও জরুরি।

 

যে কবি মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে শিখিয়েছিলেন, তাঁর শেষযাত্রার সেই বেদনাদায়ক দৃশ্য যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শ্রদ্ধা তখনই সত্যিকারের শ্রদ্ধা, যখন তার সঙ্গে থাকে সংযম, বিবেক ও মানবিকতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *