একাই নদীতে নেমে আবর্জনা পরিষ্কার, বিট্টু তবাহির কাজে নজর দেশজুড়ে
শাশ্বতী মোদক | রঙ নিউজ
রেওয়া: নদীর জলজুড়ে আবর্জনা। প্লাস্টিক, বোতল, শ্যাওলা ও নোংরায় কার্যত ঢেকে গিয়েছিল জলের একটা বড় অংশ। প্রশাসনের অপেক্ষায় না থেকে সেই নদীতে নিজেই নেমে পড়েন মধ্যপ্রদেশের ২০ বছরের যুবক সুরেন্দ্র সিং চৌধুরী। সোশ্যাল মিডিয়ায় যিনি পরিচিত ‘বিট্টু তবাহি’ নামে। নিজের খরচে পরিষ্কারের সামগ্রী কিনে দিনের পর দিন নদী থেকে আবর্জনা তুলে চলেছেন তিনি।
রেওয়া এলাকার আজনার নদীর এই উদ্যোগই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনার কেন্দ্রে। নদী পরিষ্কারের আগে ও পরে তোলা ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর বিট্টুর কাজ নজরে আসে বিভিন্ন মহলের।
বন্ধুদের নিয়ে শুরু, পরে একাই
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রথম দিকে কয়েকজন বন্ধুও বিট্টুর সঙ্গে নদী পরিষ্কারের কাজে যোগ দিয়েছিলেন। পরে তাঁরা সরে গেলেও কাজ বন্ধ করেননি তিনি। কোনও বড় যন্ত্র বা বিশেষ পরিকাঠামো ছাড়াই সাধারণ পরিষ্কারের সরঞ্জাম এবং আবর্জনা রাখার ব্যাগ নিয়ে নদীতে নামতেন।
এই কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী জোগাড়ের জন্য নিজের পকেট থেকেই টাকা খরচ করতেন বিট্টু। নদীর জল থেকে প্লাস্টিকের বোতল, বিভিন্ন ধরনের জঞ্জাল এবং জমে থাকা শ্যাওলা তুলে পাড়ে এনে ফেলতেন তিনি।
দূষিত জলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ
নদীর জলে দূষণ এবং দুর্গন্ধের মধ্যেই চলত তাঁর কাজ। দীর্ঘ সময় জলে থেকে আবর্জনা পরিষ্কার করতে হয়েছে তাঁকে। ধারাবাহিকভাবে কাজ করার ফলে নদীর একটি অংশের চেহারায় পরিবর্তন দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ছবি পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। Before–After ছবিতে একই জায়গার আগের ও পরের পরিস্থিতির পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপরই বিট্টুর উদ্যোগ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা।
প্রশংসার পাশাপাশি উঠেছে প্রশ্নও
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই বিট্টুর উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, এই কাজের পিছনে জনপ্রিয়তা পাওয়ার উদ্দেশ্য রয়েছে কি না।
তবে সমালোচনা সত্ত্বেও নদী পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিট্টু। তাঁর উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আরও বেশি মানুষের নজরে আসে আজনার নদী এবং স্থানীয় স্তরে নদী দূষণের সমস্যা।
আনন্দ মাহিন্দ্রার নজরে বিট্টু
বিট্টুর কাজের ভিডিয়ো নজরে আসে শিল্পপতি আনন্দ মাহিন্দ্রারও। ২০২৬ সালের মার্চে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় বিট্টুর কাজের ভিডিয়ো শেয়ার করে তাঁর প্রশংসা করেন।
মাহিন্দ্রার বক্তব্যের মূল বক্তব্য ছিল, সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘লাইক’ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যদি কাউকে ভালো কাজের দিকে নিয়ে যায়, সেটিও ইতিবাচক দিক হতে পারে।
এর পর বিট্টুর উদ্যোগ আরও বিস্তৃতভাবে আলোচনায় আসে।
কেভিন পিটারসেনের প্রশংসা
বিট্টুর নদী পরিষ্কারের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন প্রাক্তন ইংল্যান্ড ক্রিকেটার কেভিন পিটারসেনও। ফলে স্থানীয় একটি নদী পরিষ্কারের উদ্যোগ ক্রমে জাতীয় স্তরের সোশ্যাল মিডিয়া আলোচনায় জায়গা করে নেয়।
বিট্টুর উদ্যোগকে ঘিরে আরও একটি খবর সামনে এসেছে। স্বচ্ছতা ও পরিবেশ সচেতনতার কাজের জন্য তিনি একটি ডাচ কোম্পানিতে চাকরির প্রস্তাব পেয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
একজনের উদ্যোগ, প্রশাসনের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন
বিট্টুর উদ্যোগ প্রশংসা পেলেও তাঁর কাজ একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও নাগরিকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। একটি নদী দীর্ঘদিন ধরে আবর্জনায় ভরে থাকার পর কেন একজন তরুণকে নিজের উদ্যোগে নদীতে নেমে পরিষ্কার করতে হবে—সোশ্যাল মিডিয়ায় এই প্রশ্নও উঠেছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী পরিষ্কার রাখা শুধু কোনও ব্যক্তি বা স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব নয়। নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদীতে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
নদী পরিষ্কারের গল্পের বাইরে
বিট্টু তবাহির উদ্যোগ তাই শুধু একটি নদী পরিষ্কারের ঘটনা নয়। তাঁর কাজ দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকেও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সামনে এসেছে একটি বড় বাস্তবতা—একজন তরুণ যতই চেষ্টা করুন, একটি নদীকে দীর্ঘমেয়াদে পরিষ্কার রাখতে প্রয়োজন প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ।
নিজের হাতে নদী থেকে আবর্জনা তুলে বিট্টু যে বার্তা দিয়েছেন, তা সরল—পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা না করে উদ্যোগ নেওয়া যায়। তবে সেই পরিবর্তনকে স্থায়ী করার দায়িত্ব সমাজের সবার।
