‘এম্পেরর বনাম শরৎচন্দ্র’- পুজোয় সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবিতে ফিরছে ‘পথের দাবী’-র সেই উত্তাল সময়

এম্পেরর বনাম শরৎচন্দ্র: Emperor vs Sarat Chandra’
পুজোয় সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবিতে ফিরছে ‘পথের দাবী’-র সেই উত্তাল সময়

দেবপ্রিয়া বারিক : সিনিয়র রিপোর্টার: রঙ নিউজ

 

একদিকে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের ক্ষমতা, অন্যদিকে একজন সাহিত্যিকের কলম। মাঝখানে একটি উপন্যাস—যে উপন্যাস প্রকাশের পর শুধু পাঠকের আলোচনার বিষয় হয়ে থাকেনি, বরং ব্রিটিশ শাসনের চোখে হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক আশঙ্কার কারণ। সেই ইতিহাসকেই বড় পর্দায় নতুনভাবে দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়।
তাঁর নতুন ছবি ‘Emperor vs Sarat Chandra’-কে তাই নিছক শরৎচন্দ্রের জীবনী বা ‘পথের দাবী’-র চলচ্চিত্রায়ণ হিসেবে দেখলে হয়তো ছবিটির আসল তাৎপর্য ধরা পড়বে না। ছবির কেন্দ্রেই রয়েছে সাহিত্য, রাষ্ট্রক্ষমতা এবং বিপ্লবী চেতনার সেই সংঘাত—যেখানে একটি বইও হয়ে উঠতে পারে শাসকের কাছে রাজনৈতিক অস্ত্র।
ছবিতে শরৎচন্দ্রের চরিত্রে রয়েছেন টোটা রায়চৌধুরী, আর তাঁর সৃষ্ট বিপ্লবী চরিত্র সব্যসাচী মল্লিকের ভূমিকায় আবীর চট্টোপাধ্যায়। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন মিমি চক্রবর্তী-সহ আরও একাধিক অভিনেতা। নির্মাতাদের প্রকাশিত প্রি-টিজারও ইতিমধ্যে ছবির ঐতিহাসিক আবহ সম্পর্কে দর্শকদের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে।
যে উপন্যাস ব্রিটিশ সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল
‘পথের দাবী’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৬ সালে। শরৎচন্দ্রের কল্পিত বিপ্লবী সংগঠন এবং সব্যসাচী মল্লিকের চরিত্রের মাধ্যমে উপন্যাসটি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্য বহন করেছিল। প্রকাশের অল্প সময়ের মধ্যেই বইটি ব্রিটিশ সরকারের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে; পরে ১৯৩৯ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়।
এই ইতিহাসের একটি বিশেষ দিক হল—নিষেধাজ্ঞা সাহিত্যটির প্রভাব মুছে দিতে পারেনি। বরং একটি বইকে নিষিদ্ধ করার ঘটনাই তাকে আরও কৌতূহলের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এখানেই ‘Emperor vs Sarat Chandra’-র সম্ভাব্য নাটকীয়তার সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা।
কারণ ছবিটির সংঘাত কেবল শরৎচন্দ্র বনাম ব্রিটিশ সরকার নয়। আরও গভীরে গেলে প্রশ্নটা দাঁড়ায়—একটি রাষ্ট্র কি মানুষের চিন্তাকে নিষিদ্ধ করতে পারে?
‘এম্পেরর’ আসলে কার প্রতীক?
ছবির নামটিই দর্শকের সামনে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—‘Emperor’ বনাম ‘Sarat Chandra’ কেন?
এখানে ‘এম্পেরর’কে শুধু একজন শাসক হিসেবে দেখলে ছবিটির রাজনৈতিক স্তরটি ছোট হয়ে যায়। এটি বরং সেই ঔপনিবেশিক ক্ষমতার প্রতীক, যে ক্ষমতা সাহিত্যকে শুধুই সাহিত্য হিসেবে দেখতে পারেনি। ‘পথের দাবী’-র বিপ্লবী বক্তব্য তাই প্রশাসনের কাছে হয়ে উঠেছিল সম্ভাব্য বিদ্রোহের ভাষা।
এই কারণেই ছবিটির আসল লড়াই সম্ভবত বন্দুকের সঙ্গে কলমের নয়—ক্ষমতার সঙ্গে চিন্তার।
আবীরের সব্যসাচী—পুরনো চরিত্র, নতুন পাঠ
শরৎচন্দ্রের সৃষ্ট সব্যসাচী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় বিপ্লবী চরিত্র। এবার সেই চরিত্রে আবীর চট্টোপাধ্যায়। অন্যদিকে টোটা রায়চৌধুরীর শরৎচন্দ্র যেন সেই চরিত্রের স্রষ্টা এবং নিজের সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার সাক্ষী—দুই ভূমিকাকে একই ছবির ভেতরে পাশাপাশি দাঁড় করাচ্ছেন পরিচালক।
ফলে গল্পটি শুধু ‘সব্যসাচীর বিপ্লব’-এর গল্প হওয়ার কথা নয়; বরং যে মানুষটি সব্যসাচীকে সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁর নিজের সময়, ভয়, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং লেখার দায়বদ্ধতার গল্পও হয়ে উঠতে পারে। ছবির প্রকাশিত তথ্যেও শরৎচন্দ্রের বাস্তব জীবন এবং তাঁর সৃষ্ট বিপ্লবী চরিত্রের জগতকে পাশাপাশি দেখানোর ইঙ্গিত রয়েছে।
১০০ বছরের পুরনো প্রশ্ন, আজও অচেনা নয়
‘পথের দাবী’-র শতবর্ষকে ঘিরেই ছবিটির নির্মাণ। কিন্তু শতবর্ষ উদ্‌যাপনের চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে অন্য একটি বিষয়—শত বছর পরেও সাহিত্য ও ক্ষমতার সম্পর্কের প্রশ্নটি কেন প্রাসঙ্গিক?
একসময় ঔপনিবেশিক সরকার একটি বইয়ের রাজনৈতিক অভিঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছিল। আজকের দর্শকের কাছে সেই ইতিহাস হয়তো দূরের ঘটনা। কিন্তু মতপ্রকাশ, সাহিত্যিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক—এই প্রশ্নগুলি এখনও ইতিহাসের পাতায় আটকে নেই।


সৃজিতের ছবির গুরুত্ব সেখানেই—পুরনো একটি ঘটনার পুনর্নির্মাণের বদলে যদি ছবিটি সেই সময়ের মানসিকতা ও ক্ষমতার কাঠামোকে সামনে আনতে পারে, তবে ‘পথের দাবী’ শুধু একটি পুরনো উপন্যাস থাকবে না; হয়ে উঠবে একটি সময়ের আয়না।
পুজোয় বড় পর্দায় ইতিহাসের মুখোমুখি বাংলা
ছবিটির প্রাথমিকভাবে ঘোষিত মুক্তির পরিকল্পনায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে নির্মাতাদের প্রচার এবং চলচ্চিত্র-তথ্যসূত্র অনুযায়ী ছবিটি অক্টোবর ২০২৬-এ দুর্গাপুজোর সময়ে, ১৬ অক্টোবর মুক্তির জন্য তালিকাভুক্ত।


পুজোর আনন্দের মরসুমে তাই দর্শকের সামনে আসছে এমন এক গল্প, যার মূল চরিত্র কোনও কাল্পনিক রাজা বা যুদ্ধ নয়—একজন লেখকের কলম।
আর সেই কলমের সামনে দাঁড়িয়ে একটি সাম্রাজ্য।
‘Emperor vs Sarat Chandra’-র সবচেয়ে বড় কৌতূহল তাই কে জিতবে, সেই প্রশ্নে নয়। বরং ছবিটি শেষ হওয়ার পর দর্শকের মনে যদি একটি প্রশ্ন থেকে যায়—
“শাসক একটি বই নিষিদ্ধ করতে পারে, কিন্তু সেই বইয়ের ভিতরে জন্ম নেওয়া প্রশ্নগুলোকেও কি নিষিদ্ধ করতে পারে?”
তাহলে কি শরৎচন্দ্রের একশো বছরের পুরনো ‘পথের দাবী’ নতুন সময়ের কাছে আবার নিজের দাবি জানাবে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *