চীনের ‘কৃত্রিম সূর্য’ প্রকল্পে যুগান্তকারী সাফল্য: তৈরি হল বিশ্বের বৃহত্তম সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক
প্রতীক চ্যাটার্জী, সাব এডিটর, রঙ নিউজ
সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে চীনের নতুন “কৃত্রিম সূর্য” (Artificial Sun) চালু করার খবর বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বাস্তবে চীন নতুন কোনো নক্ষত্র তৈরি করেনি, বরং তারা নিউক্লিয়ার ফিউশন (Nuclear Fusion) বা পরমাণু সংযোজন প্রযুক্তিতে এক বিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং সাফল্য অর্জন করেছে।
৫৮২ টনের এক অতিকায় চুম্বক
২০২৬ সালের জুলাই মাসে, চীনের হেফেই শহরে অবস্থিত চাইনিজ একাডেমি অফ সায়েন্সেস-এর ইনস্টিটিউট অফ প্লাজমা ফিজিক্স (ASIPP) একটি ফিউশন রিঅ্যাক্টরের জন্য তৈরি বিশ্বের বৃহত্তম সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বকের সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
D-আকৃতির এই টরয়ডাল-ফিল্ড (TF) চুম্বকটি লম্বায় ২১ মিটার, চওড়ায় ১২ মিটার এবং এর ওজন প্রায় ৫৮২ মেট্রিক টন। ফ্রান্সে নির্মাণাধীন আন্তর্জাতিক ITER প্রকল্পের চুম্বকের তুলনায় এটি আয়তনে প্রায় ১.৩ গুণ বড় এবং তিনগুণ বেশি চৌম্বকীয় শক্তি সঞ্চয় করতে সক্ষম। সবচেয়ে বড় কথা, চীনা বিজ্ঞানীরা ১০০% দেশীয় প্রযুক্তি ও উপাদান ব্যবহার করে এই অতিকায় যন্ত্রটি তৈরি করেছেন।
“কৃত্রিম সূর্য” মূলত একটি নিউক্লিয়ার ফিউশন রিঅ্যাক্টরের ডাকনাম। আমাদের আসল সূর্য ঠিক যেভাবে শক্তি উৎপন্ন করে—হাইড্রোজেন পরমাণুর সংযোজনের মাধ্যমে—সেই প্রক্রিয়াটিকেই পৃথিবীতে কৃত্রিমভাবে করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোনো কার্বন নিঃসরণ বা দীর্ঘস্থায়ী তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ছাড়াই বিপুল পরিমাণ পরিচ্ছন্ন শক্তি (Clean Energy) পাওয়া সম্ভব।
এই প্রক্রিয়াটি পৃথিবীতে ঘটাতে হলে হাইড্রোজেন গ্যাসকে উত্তপ্ত করে প্লাজমায় পরিণত করতে হয়, যার তাপমাত্রা ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায় (যা সূর্যের কেন্দ্রের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি উত্তপ্ত)। পৃথিবীর কোনো ভৌত পদার্থ এই চরম তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে না; যেকোনো পাত্র মুহূর্তের মধ্যে গলে যাবে।
ঠিক এখানেই এই বিশাল চুম্বকগুলোর ভূমিকা অপরিহার্য। এরা ‘টোকামাক’ (Tokamak) নামক একটি ডোনাট-আকৃতির ভ্যাকুয়াম চেম্বারের ভেতরে এক অদৃশ্য ও অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বকীয় “খাঁচা” তৈরি করে। এই চৌম্বক ক্ষেত্র অতি-উত্তপ্ত প্লাজমাকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখে, যাতে তা রিঅ্যাক্টরের দেয়াল স্পর্শ করতে না পারে। ফলে ফিউশন প্রক্রিয়াটি নিরাপদে চলতে থাকে।
এই নতুন চুম্বকটি চীনের বর্তমান EAST রিঅ্যাক্টরে (যা ইতিমধ্যেই ১৭ মিনিটের বেশি সময় ধরে গরম প্লাজমা ধরে রাখার রেকর্ড গড়েছে) ব্যবহার করা হবে না। এটি তৈরি করা হচ্ছে চীনের পরবর্তী প্রজন্মের রিঅ্যাক্টর BEST (Burning Plasma Experimental Superconducting Tokamak)-এর জন্য।
এই প্রকল্পের সফল সমাপ্তি চীনের একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে দিয়েছে, নতুন BEST রিঅ্যাক্টরের নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হওয়ার প্রত্যাশা আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য।

বাণিজ্যিকভাবে ফিউশন শক্তির ব্যবহার হয়তো এখনও বেশ কয়েক বছর দূরে, তবে এই মাপের অত্যাধুনিক চুম্বক তৈরি প্রমাণ করে যে ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনিয়ারিং ক্রমশ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
