‘তিনি রোদ্দুর হতে চেয়েছিলেন’

‘তিনি রোদ্দুর হতে চেয়েছিলেন’

 

(প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রয়াণ দিবসে বিশেষ সম্পাদকীয়)

 

✍🏾সোমনাথ মুখোপাধ্যায়: Rong News

 

অস্তমিত শেষ বেলায় কিরণ দেওয়া রক্তিম সূর্য। বন্ধ হয়েছে দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের রাজনৈতিক জীবনের শেষ পাতা। শেষ হয়েছে শুভ্র ধুতি পাঞ্জাবির, সুসাংস্কৃতিক চেতনাসম্পন্নের কর্মজীবন। শেষ হয়েছে আটপৌরে জীবনযাত্রার আদ্যন্ত বাঙালির আজীবন সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অন্যতম ধারক ও বাহকের। ৮ই অগস্ট শ্রাবণের মেঘলা সকালে, ৮.২০ মিনিটে ৮০ বছর বয়সে নিজের বাসভবন থেকেই না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ২ বছর হয়ে গেল। তবু মনে হয় এই তো সেদিন!

১৯৪৪ সালের ১লা মার্চ উত্তর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন বাঙালি হৃদয়ে দোলা লাগানো কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইপো বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এনসিসি নৌবাহিনীর ক্যাডেট বরাবরের কৃতি ছাত্র বুদ্ধদেব কলকাতার শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্স নিয়ে ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজে। রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি ছাত্র রাজনীতির হাত ধরে। বামপন্থী মতাদর্শের প্রতি আস্থাবান বুদ্ধদেব জড়িয়ে পড়েন খাদ্য আন্দোলনে। সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে। ছিলেন সিপিআইএম যুব সংগঠন গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের রাজ্য সম্পাদক। পরবর্তীতে সিপিআইএমের সদস্যপদ লাভের পর ১৯৭৭ সালে উত্তর কলকাতার কাশীপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জিতে বিধায়ক হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। পাশে পান সিপিআইএম প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত, কাকাবাবু মুজফ্ফর আহমেদ, সরোজ মুখার্জি, জ্যোতি বসু, সোমনাথ চ্যাটার্জির মতো বিশিষ্ট নেতাদের। ১৯৮২ সালে কংগ্রেসের প্রফুল্লকান্তি ঘোষের কাছে হেরে গেলেও বাঙালির মননে জায়গা করে নেন সুস্থ রাজনীতির পাশাপাশি সাহিত্য ও নাটক চর্চা করা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। লেখালেখির পাশাপাশি রবীন্দ্র সাহিত্যে তাঁর অগাধ পান্ডিত্য মুগ্ধ করেছিল আপামর বাঙালিকে। রেকর্ড সংখ্যক বিক্রি হয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর তাঁর লেখা ‘স্বর্গের নিচে মহা বিশৃঙ্খলা ‘ শীর্ষক বইটি।

 

দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি রাজনৈতিক জীবনে ৫ বারের বিধায়ক হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ১৯৮৭ সাল থেকে একটানা জিতে এসেছেন যাদবপুর বিধানসভা থেকে। ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসাবে সামলেছেন তথ্য ও জনসংযোগ দপ্তর যা পরে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর বলে পরিচিত হয়। পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর মন্ত্রীসভায় পৌর ও নগরোন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন ১৯৯৯ সালে উপমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নেওয়া বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এরপর ২০০১ ও ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জিতে পরপর দুবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিত নন্দনের গড়ে ওঠা আজন্ম সাংস্কৃতিক তাঁরই হাত ধরে। রাজ্যের সপ্তম মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি তাঁর দল সিপিআইএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ছিলেন পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্যও। ২০১১ সালে পরিবর্তনের হাওয়ায় রাজ্যে পালাবদলের সময় নির্বাচনে পরাজিত হন তিনি। রাজনৈতিক জীবনে জয় পরাজয় থাকেই। সেটি বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা সেই শ্বেতশুভ্র টানটান ধুতি পাঞ্জাবি, দৃপ্ত হাঁটার ভঙ্গিতে পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাসের মানুষটির সার্বিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখা। স্বপ্ন দেখতে শেখানো। আজ চারিদিক বড়ো ধূসর! মিথ্যার বেসাতি আকাশ ছুঁয়েছে। ধর্মীয় উদগ্র উন্মাদনার নগ্ন আস্ফালন বুকে কাঁপন ধরাচ্ছে। আজ যে সেই অভিভাবকসম তাঁকেই বড়ো বেশি প্রয়োজন ছিল।

 

মানুষ চিরকাল থাকে না। থেকে যায় তার কাজ। থেকে যায় নির্দিষ্ট মতাদর্শ অনুসরণের গভীর অভিনিবেশের বিনম্র স্বাক্ষর। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রোদ্দুর হতে চেয়েছিলেন। স্নাত করাতে চেয়েছিলেন সকলকে। হয়ে ওঠেনি সবটা। শ্রাবণের মেঘলা সকালে হয়তো বা তাই রয়ে যায় ‘স্বর্গের নিচে মহা বিশৃঙ্খলা!’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *