নষ্টচন্দ্র নয়, আসছে মাসের শেষদিন হ্যালোউইন হ্যালোউইন….
অমিত গোস্বামী , রঙ নিউজ
আমেরিকা সাজছে হ্যালোউইনের সাজেঃ
কলকাতায় দুর্গাপুজো শেষ। মন্ডপ খোলার পর্ব। আমেরিকা প্রস্তুতি নিচ্ছে একটি উৎসবের। হ্যালোউইন। বাড়িগুলি সেজে উঠছে অদ্ভুতুড়ে সজ্জায়। কোথাও কংকাল ঝুলছে, ডাকিনী-যোগিনীরা মুখ ভেংচে স্থির, পেল্লায় মিষ্টি কুমড়ো কিনে তার পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে তারপর খোদাই করে একজোড়া বাঁকা চোখ আর ফোকলা দাঁতের খলনায়কোচিত হাসি ফুটিয়ে ভেতরে আলো জ্বালিয়ে দেওয়া। কুৎসিত, উদ্ভট আর কিম্ভূতকিমাকার করে বাড়ির সামনে সাজানো পর্ব চলছে এখন।
হ্যালউইন উৎসবটা কী? কী হয় এই উৎসবে?
হ্যালোউইন (Halloween) হলো মূলত পশ্চিমা বিশ্বের একটি প্রাচীন লোকঐতিহ্য ও উৎসব, যা আধুনিককালে ভৌতিক সাজসজ্জা, কস্টিউম পার্টি এবং মজার বিনোদনের এক বৈশ্বিক উৎসবে রূপ নিয়েছে। প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর সন্ধ্যায় ও রাতে হ্যালোউইন পালিত হয়। কী কী ঘটে এই উৎসবে?
১) জ্যাক-ও’-ল্যান্টার্ন (Jack-o’-lantern): পাকা মিষ্টি কুমড়ার ভেতরের অংশ ফাঁপা করে বাইরের অংশে চোখ, নাক ও ভয়ংকর মুখের আকৃতি খোদাই করা হয়। এরপর এর ভেতরে মোমবাতি জ্বালিয়ে অন্ধকার বারান্দায় বা জানালায় রাখা হয়।
২) ভৌতিক সাজ ও কস্টিউম পার্টি: কেবল শিশুই নয়, প্রাপ্তবয়স্করাও রক্তচোষা ড্রাকুলা, জম্বি, কঙ্কাল কিংবা প্রিয় সিনেমা-কার্টুনের চরিত্রের অদ্ভুত পোশাকে সেজে পার্টিতে যোগ দেন।
৩) ভুতুড়ে বাড়ির সাজসজ্জা: মানুষ নিজেদের বাড়িঘর কৃত্রিম মাকড়সার জাল, কঙ্কাল, ভৌতিক আলো ও সমাধিফলক দিয়ে ভুতুড়ে বাড়ির (Haunted House) মতো সাজিয়ে তোলে।
৪) হরর সিনেমা ও গল্প বলা: এই রাতে বন্ধু ও পরিবার মিলে ভূতের সিনেমা দেখা কিংবা ক্যাম্পফায়ারের পাশে বসে গা ছমছমে অতিলৌকিক গল্প শোনার চল রয়েছে।
৫) অ্যাপল ববিং (Apple Bobbing): জলে ভাসমান আপেলকে হাত না লাগিয়ে কেবল মুখ দিয়ে তুলে আনার একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা।
৬) ট্রিক অর ট্রিট (Trick or Treat): এটি হ্যালোউইনের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্ব। এলাকার শিশুরা ভূত, ডাইনি, ভ্যাম্পায়ার বা সুপারহিরোর পোশাক পরে পাড়ার বাড়ি বাড়ি গিয়ে কড়া নাড়ে এবং বলে “ট্রিক অর ট্রিট!”। বাড়ির মালিকরা হাসিমুখে তাদের ঝুড়িতে চকলেট বা ক্যান্ডি (‘ট্রিট’) দেন। যদি কেউ কিছু না দেয়, তবে শিশুরা সেখানে কোনো নির্দোষ দুষ্টুমি বা বায়নাক্কা (‘ট্রিক’) করতে পারে। তাতে মালিক কিচ্ছু বলতে পারবেন না।
এই উৎসবের পিছনের ইতিহাস কী?
হ্যালোউইনের উৎপত্তি প্রায় দুই হাজার বছর আগে প্রাচীন সেল্টিক (Celtic) জনগোষ্ঠীর ‘সামহাইন’ উৎসব থেকে। সেল্টিকরা বিশ্বাস করত, ৩১ অক্টোবরের রাত হলো গ্রীষ্মের শেষ ও শীতের (অন্ধকার ও মৃত্যুর প্রতীক) শুরু। তাদের ধারণা ছিল, এই রাতে জীবিতদের জগৎ ও মৃতদের জগতের মাঝের পর্দা অদৃশ্য হয়ে যায় এবং বিদেহী আত্মারা পৃথিবীতে ফিরে আসে। অশুভ প্রেতাত্মারা যাতে মানুষের ক্ষতি না করতে পারে বা নিজেদের স্বজাতি ভেবে বিভ্রান্ত হয়, সেজন্য সেল্টিকরা পশুর চামড়া ও মুখোশ পরে ছদ্মবেশ নিত এবং বড় অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে রাখত। ৮ম শতকে পোপ গ্রেগরি (তৃতীয়) ১ নভেম্বরকে ‘অল সেন্টস ডে’ ঘোষণা করেন। এর ফলে পূর্বের পৌত্তলিক সামহাইন উৎসবটি খ্রিস্টীয় ‘অল হ্যালোজ ইভ’-এর সঙ্গে মিশে যায় এবং কালক্রমে সংক্ষেপে ‘হ্যালোউইন’ নামে পরিচিতি পায়। উনিশ শতকে আইরিশ অভিবাসীদের হাত ধরে উৎসবটি আমেরিকায় পৌঁছায় এবং সেখান থেকেই বিশ্বব্যাপী বিনোদনমূলক উৎসবে পরিণত হয়।
হ্যালউইনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারন কী?
মানুষ সারাবছর হাজার নিয়মকানুন মেনে সুসভ্য জীবন যাপন করার ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে এই দিন। এ’দিন নিজের খোলস ছেড়ে রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার সাজলেও সমাজ চোখ রাঙাবে না, বরং হাততালি দিয়ে একমুঠো চকোলেট বাড়িয়ে দেবে—তবে সেই দিনটিকে ভালো না বেসে উপায় কী? হ্যালোউইনের মূল জাদু ঠিক এখানেই। এটি ভয় পাওয়ার উৎসব নয়, বরং ভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে উদ্দাম হাসাহাসির এক নিখাদ ছুতো। বাচ্চাদের থেকেও তাই বড়রা বেশি মাতেন হুল্লোড়ে। হ্যালোউইনের সবচেয়ে মিষ্টি ও সরস পর্বটি নিঃসন্দেহে ‘ট্রিক অর ট্রিট’। শিশুদের কাছে এটি এক বৈধ ডাকাতির লাইসেন্স! অদ্ভুতুড়ে পোশাকে খুদের দল পাড়ার দরজায় কড়া নেড়ে গম্ভীর গলায় হুমকি দেয়—”মিষ্টি দেবে, নাকি দুষ্টুমি করব?” প্রতিবেশীরাও হাসিমুখে তাদের ঝুড়িতে চকোলেট আর ক্যান্ডি ঢেলে দেন। বড়দের জন্য এর চেয়ে আনন্দদায়ক সামাজিক মেলবন্ধন আর কী হতে পারে? পাড়ার যে মানুষটির সাথে সারা বছর চোখাচোখি হলেও কথা হতো না, তিনিও আলো জ্বালিয়ে একগাল হেসে শিশুদের স্বাগত জানান। এই দিন ভয়কে জয় করারও দিন।
আমাদের ধর্মে এমন দিন কি নেই?
অবশ্যই আছে, কিন্তু আমরা ভুলতে চেয়েছি বলে ভুলে গেছি। নষ্টচন্দ্র বা ‘কলঙ্ক চতুর্থী’। শাস্ত্রীয় গণনা অনুযায়ী, হিন্দু পঞ্জিকার ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে নষ্টচন্দ্র পালিত হত । এখন হয় কিনা জানি না, তবে আমার ছোটবেলায় হত। এই তিথির মূল পালনীয় নিয়ম হলো রাতে কোনোভাবেই চাঁদের দিকে না তাকানো। কেন তাকাবো না? এর পিছনে দু’টি কাহিনী আছে।
গণেশের অভিশাপঃ
একদিন কুবেরের ভবনে অতিরিক্ত ভোজন সেরে দেবতা গণেশ তাঁর বাহন ইঁদুরের পিঠে চড়ে ফিরছিলেন। পথে একটি সাপ দেখে ইঁদুর চমকে ওঠায় গণেশ মাটিতে পড়ে যান। লম্বোদর গণেশের এই আকস্মিক পতন ও স্থূল শরীর দেখে রূপবান চন্দ্রদেব অহংকারের বশে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন। নিজের রূপের দম্ভে অন্যকে উপহাস করার অপরাধে গণেশ চন্দ্রকে অভিশাপ দেন যে চন্দ্রের সমস্ত আলো ও দ্যুতি চিরতরে বিলুপ্ত হবে।
পরবর্তীতে চন্দ্রদেব ও অন্য দেবতাদের ক্ষমা প্রার্থনায় গণেশ শাপ কিছুটা লঘু করেন এবং বলেন—চন্দ্র সম্পূর্ণরূপে আলোহীন হবে না, বরং পক্ষের সাথে সাথে তার কলার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটবে। তবে ভাদ্র মাসের এই শুক্লা চতুর্থী তিথিতে যে ব্যক্তি চাঁদের দিকে তাকাবে, তাকে বিনা দোষে সমাজে মিথ্যা অপবাদ ও লাঞ্ছনা ভোগ করতে হবে।
কথিত আছে, স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণও অসাবধানতাবশত ভাদ্র চতুর্থীর রাতে জলে প্রতিবিম্বিত নষ্টচন্দ্র দর্শন করেছিলেন। এর ফলেই রাজা সত্রাজিতের হারিয়ে যাওয়া দিব্য ‘স্যমন্তক মণি’ চুরির মিথ্যা অপবাদ কৃষ্ণের ঘাড়ে এসে পড়েছিল। পরবর্তীতে শ্রীকৃষ্ণ ভাল্লুকরাজ জাম্ববানের সাথে যুদ্ধ করে সেই মণি উদ্ধার করেন এবং নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করে অপবাদমুক্ত হন।
নষ্টচন্দ্রের দুষ্টুমি ও ফল চুরির লোকবিশ্বাস
এইদিন চাঁদ দেখলে যে সমাজে মিথ্যা অপবাদ ও লাঞ্ছনা ভোগ করার অভিশাপের একটি প্রতিষেধক আছে – যদি সেই রাতে কারও বাগান বা ঘর থেকে কিছু চুরি করে তার মুখ থেকে পেটভরে গালাগালি খাওয়া যায়, তবে চন্দ্রদর্শনের সেই দোষ বা পাপ নাকি কেটে যায়! আমার বেশ মনে আছে যে বয়স্করা চাঁদ দেখার ভয়ে বেরোতেন না। আমরা বাগানে ঢুকে নারকেল, পেয়ারা, ডালিম চুরি করতাম। আর যে বিশেষ নামে ডাকলে গালি দেন, সেই নামে ডাকাডাকি করতাম। আর অনেক বয়স্কই ঝেড়ে খিস্তি করতেন। আমাদের নষ্টচন্দ্রের রাতের নষ্টামি পূর্ণতা পেত।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির বধূ জ্ঞানদানন্দিনী দেবী (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী)-র আত্মজীবনীমূলক লেখায় পেয়েছিলাম – “নষ্টচন্দ্রের রাত্রে খুব মজা হত। পাড়াপড়শীর বাড়ী থেকে সেদিন ফল তরকারি প্রভৃতি কিছু একটা চুরি করে আনতেই হবে, এমন করে যাতে ধরা না পড়ে। নিজের বাগানের চোরকে ধরা আর পরের বাগান থেকে ধরা না পড়ে কিছু চুরি করে আনা—এই নিয়ে খুব ছুটোছুটি হুটোপুটি হাসাহাসি পড়ে যেত।”
‘নষ্টচন্দ্র’ নেই, জমছে হ্যালোউইনঃ
হ্যালউইন ও নষ্টচন্দ্র মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনটা শুধু গোমড়ামুখো দায়িত্বের বোঝা নয়। মাঝে মাঝে মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দুষ্টু শিশুটিকে বাইরে এনে অট্টহাসি হাসা দরকার। তবে আমাদের দেশে দুষ্টুমি বা নষ্টামি এখন হুঁকোমুখোহ্যাংলাদের বিরক্তি তৈরি করে কারন তারা বিশ্বাস করেন – চলো নিয়ম-মতে, দূরে তাকিয়ো নাকো, ঘাড় বাঁকিয়ো নাকো, চলো সমান পথে। নইলে বড় হবে কী’করে? তাই ‘নষ্টচন্দ্র’ নেই হয়ে গেছে, জমে গেছে হ্যালোউইন।
