নাঙ্গাবাবা তোতাপুরী মহারাজ
✍🏾সোমনাথ মুখোপাধ্যায়:Rong News
মূর্তি স্থাপন করে পুজো অর্চনা করা ছিল তাঁর কাছে মূল্যহীন। তিনি বিশ্বাস করতেন সর্বং ব্রহ্মময়ং জগৎ অর্থাৎ জগৎ সংসারের সবকিছুই সাক্ষাৎ ব্রহ্মের স্বরূপ। তিনি তপোভূমি ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক জগতের পরম অদ্বৈতবাদী বৈদান্তিক সাধক নাঙ্গাবাবা তোতাপুরী মহারাজ। তাঁর কথায়, দশ বার গীতা শব্দ উচ্চারণ করলেই গীতাপাঠ করা হয়। গীতার সার সত্য হলো ত্যাগ। তাই গীতা শব্দ উচ্চারণকারী ত্যাগী ভিন্ন আর কিছু নয়। তাঁর সাধন গুরুর সম্পর্কে এ কথাই তাঁর ভক্ত, শিষ্যদের বলতেন যুগাবতার ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব।
দীর্ঘকায়, আজানুলম্বিত জটাজুটধারী, দীর্ঘ শ্মশ্রু, গুম্ফ শোভিত সন্ন্যাসী ছিলেন নাঙ্গাবাবা তোতাপুরী মহারাজ। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন পাঞ্জাবে। দীর্ঘ চল্লিশ বছর পবিত্র নর্মদা তটে কঠোর তপস্যার পর বেছে নেন পরিব্রাজকের জীবন। কৌপিন মাত্র সম্বল করে ত্রিশূলধারী সাধককে পরম শ্রদ্ধায় নাঙ্গাবাবা বা দিগম্বর বাবা বলে সম্বোধন করত মানুষ। কখনো বা কাঁকরিয়া বাবা বলেও ডাকত তাঁকে। তবে তাঁর আসল নাম ছিল তোতাপুরী। পরমব্রহ্মের ইচ্ছায় আকাশবৃত্তি অবলম্বন করেই তাঁর ২৫০ বছরের দীর্ঘ সাধন জীবন কাটান পুরী সম্প্রদায়ভুক্ত বেদান্তবাদী তোতাপুরী মহারাজ। সাধক জীবনের বেশ কিছু বছর তিনি বাস করেন ওড়িশার পুরী শহরের বাইরে গীর্ণারিবন্তের অদ্বৈত আশ্রমে। যেখানেই গিয়েছেন পরম শ্রদ্ধায় তাঁর চরণে লুটিয়ে পড়েছে সংসারের তাপদগ্ধ অসংখ্য মানুষ।
কোনোও জায়গায় তিন দিনের বেশি থাকতেন না তোতাপুরী। সালটা ১৮৬৪। তীর্থ সেরে ফেরার পথে দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গাপারে দেখা পেলেন যুবক গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের। বাকিটা ইতিহাস। তোতাপুরীর করা প্রশ্ন- “বেদান্ত সাধন করোগে বেটা”-র উত্তরে মন্দিরে ভবতারিণীর কাছে অনুমতি পেয়ে তোতাপুরীর কাছে দীক্ষা নিয়ে পঞ্চবটীতে ধুনি জ্বালিয়ে ধ্যানে নিমগ্ন হলেন গদাধর। ত্রিশূল হাতে শিষ্যকে পাহারা দিতে শুরু করলেন ভীমকায় তোতাপুরী। মাত্র তিন দিনের মধ্যে নির্বিকল্প সমাধিতে সিদ্ধিলাভ করে তোতাপুরীর দেওয়া ‘রামকৃষ্ণ পরমহংস’ উপাধি পান গদাধর চট্টোপাধ্যায়! সেই থেকে রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসী মহারাজরা সকলে পুরী সম্প্রদায়ভুক্ত।

দক্ষিণেশ্বরে তোতাপুরী থাকেন প্রায় তিন মাস। যাওয়ার আগে অপার সৌজন্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চরম নিদর্শন হিসেবে শিষ্য রামকৃষ্ণদেবকে গুরু মেনে তাঁর কাছে দীক্ষা নেন তোতাপুরী!
পাত্রকে ঘষামাজার মধ্যে রাখতে হয় নচেৎ তা মলিন হয়ে যায় বলতেন তোতাপুরী। অর্থাৎ সাধককে সবসময় সাধন ভজনের মধ্যে থাকতে হয় নতুবা সাধনালব্ধ শক্তি দ্রুত বিনষ্টের পথে পা বাড়াবে। সাধক কখনো সঞ্চয় করবে না। আকাশবৃত্তিই হবে তার জীবনধারণের একমাত্র উপায়।
পরম করুণাময় সাধক নাঙ্গাবাবা তোতাপুরী মহারাজ। সময়টা ১৯৪৯। গীর্ণারিবন্তের অদ্বৈত আশ্রমে প্রতিদিন দুধ দিত মধু গোয়ালা। তার একমাত্র পুত্র কিশোর বংশীধর জন্মান্ধ। তোতাপুরী মহারাজের কৃপায় অন্ধত্ব ঘুচে গিয়ে চোখে দেখতে সক্ষম হয় বংশীধর। পরবর্তীতে বহু মানুষ এসেছেন তাঁর পূণ্য সান্নিধ্যে। দিশা পেয়েছেন সংসারের কঠিন পথ চলার। বহু আর্তজনকে কাছে টেনে নিয়েছেন অতলান্ত প্রেমের করুণাময় সাগরের অধিকারী নাঙ্গাবাবা তোতাপুরী মহারাজ। ধারণ করেছেন তাদের দুরারোগ্য ব্যাধিও। তেমনই এক ভক্তের দুরারোগ্য বহুমুত্র রোগ নিজের শরীরে ধারণ করে প্রায় ২৫০ বছর বয়সে ১৯৬১ সালের ২৮শে অগস্ট দেহত্যাগ করেন নাঙ্গাবাবা তোতাপুরী মহারাজ।।
