মহাকাশে নক্ষত্রের শেষ নিঃশ্বাস: জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে ধরা পড়ল অপূর্ব ‘লায়ন নেবুলা’

*মহাকাশে নক্ষত্রের শেষ নিঃশ্বাস: জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে ধরা পড়ল অপূর্ব ‘লায়ন নেবুলা’*

 

প্রতীক চ্যাটার্জী, রঙ নিউজ

 

মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে ফের এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছে নাসা, ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ESA) এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির (CSA) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST)। মহাকাশের গভীরে একটি মৃতপ্রায় নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘লায়ন নেবুলা’ (NGC 2392)-র অভূতপূর্ব ইনফ্রারেড ছবি প্রকাশ্যে এসেছে। দূর মহাশূন্যে একটি নক্ষত্রের অন্তিম পর্যায়ের রূপান্তর এবং গ্যাস-ধূলিকণার জাদুকরী বিন্যাস বিজ্ঞানীদের মুগ্ধ করেছে।

 

মহাজাগতিক নিয়মে বিশালাকার ভারী নক্ষত্রগুলির মৃত্যু সাধারণত ঘটে প্রলয়ঙ্করী সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে। তবে আমাদের সূর্যের মতো মাঝারি ও কম ভরের নক্ষত্রের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ আলাদা। জীবনের শেষ পর্যায়ে জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে এই ধরনের নক্ষত্রগুলি অস্থির হয়ে পড়ে এবং তাদের বাইরের গ্যাসীয় ও ধূলিকণার স্তর ধীরে ধীরে মহাশূন্যে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কেন্দ্রস্থলে অবশিষ্ট হিসেবে পড়ে থাকে অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন শ্বেত বামন (White Dwarf) নক্ষত্র।

 

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের নিয়ার-ইনফ্রারেড (NIRCam) এবং মিড-ইনফ্রারেড (MIRI) ক্যামেরার সংমিশ্রণে তোলা ছবিতে দেখা যাচ্ছে, নীহারিকাটির কেন্দ্রস্থলটি যেন একটি সিংহের মুখের মতো আকার নিয়েছে। কেন্দ্রে অবস্থিত শ্বেত বামন নক্ষত্রটিকে সিংহের নাকের বোতামের মতো দৃশ্যমান হয়েছে, যার তীব্র অতিবেগুনি বিকিরণ ও তাপে আশেপাশের আয়নিত হাইড্রোজেন গ্যাসীয় মেঘ উত্তপ্ত হয়ে এক আশ্চর্য রঙের আভা তৈরি করেছে।

 

নীহারিকাটির চারপাশের কাঠামোতে দুটি স্পষ্ট স্তর ফুটে উঠেছে। ভিতরের স্তরটিতে আয়নিত গ্যাসের বুদবুদ এবং ফাঁপা বলয়াকার গঠন দেখা যায়, যা ধূলিকণাকে ক্রমাগত দূরে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে, বাইরের স্তরটি সিংহের কেশরের (Mane) মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কেশরের প্রান্তভাগে দেখা গেছে ধূমকেতুর লেজের মতো প্রসারিত ঘন ধূলিকণার দীর্ঘ গুচ্ছ, যা কেন্দ্রীয় বিকিরণের হাত থেকে তার পেছনের উপাদানগুলিকে রক্ষা করে চলেছে।

 

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের চোখে এই মহাজাগতিক দৃশ্য যতই অপরূপ হোক না কেন, মহাবিশ্বের সময়সীমার নিরিখে এটি অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী প্রায় ১০,০০০ বছরের মধ্যে এই গ্যাস ও ধুলোর মেঘ সম্পূর্ণভাবে মহাশূন্যে মিলিয়ে যাবে। তবে বিলীন হওয়ার আগে নক্ষত্রের নির্গত এই মৌলিক উপাদানগুলি মহাবিশ্বের আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমকে সমৃদ্ধ করবে, যা পরবর্তীতে নতুন নক্ষত্র এবং গ্রহমণ্ডলী গঠনে কাঁচামাল হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *