” সম্ভবামী যুগে যুগে ”
(জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বিশেষ প্রতিবেদন)
✍🏾সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
ভাদ্র মাসের তুমুল ঝড়জলের রাত। মথুরায় কংসের কারাগারে সব রক্ষীরা নিদ্রামগ্ন। শুধু নিদ্রাহীন দুই বন্দি বসুদেব ও তাঁর স্ত্রী দেবকী। উল্টোদিকে গরাদের পিছনে আরও এক বন্দি রাজা উগ্রসেন। তিনিও নিদ্রাহীন। এল সেই মহাসন্ধিক্ষণ। কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি। জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে চলছে বৃষ রাশি, বৃষ লগ্ন। আকাশে তখন রোহিণী নক্ষত্র। আসছেন সেই অবতার। যুগে যুগে যখনই ধরাধাম পাপে পরিপূর্ণ হয়, অধর্ম প্রবলভাবে মাথাচাড়া দেয়, তখনই তিনি আসেন! বিভিন্ন নামে। বিভিন্ন রূপে। আসেন পুনরায় ধর্ম স্থাপন করতে।

অবশেষে তিনি এলেন। দেবকীর অষ্টম গর্ভের কোল আলো করা বসুদেবের ঔরসজাত বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ। তারপর কেটে গিয়েছে কত কাল। মথুরায় আবির্ভূত হয়ে, গোকুলে নন্দগৃহে শৈশব, কৈশোর কাটিয়ে, রাধাবিহারী হয়ে বৃন্দাবনকে তাঁর অসংখ্য লীলার সাক্ষী রেখে দ্বারকায় রাজ্যপাট সামলানো। এর মাঝে কংস, শিশুপাল, পুতনা, বকাসুর প্রভৃতি দুষ্কৃতী বধ। যমুনায় কালীয়দমন। পরবর্তীতে ঊননব্বই বছর বয়সে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে পান্ডবদের পক্ষে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা ও একশো পঁচিশ বছর বয়সে প্রভাসে দেহত্যাগ। তিনি ভারতপুরুষ পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর মুখনিঃসৃত অমূল্য বাণীই গীতা। শ্রী শ্রী মদ্ভাগবতগীতায় যেমন তিনি বলেছেন –“ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামী যুগে যুগে!” ঠিক তেমনই বলেছেন-
“অহম্ একম্ দ্বিতীয় নাস্তি!” তিনিই এক ও অভিন্ন। তাঁর দ্বিতীয় নেই। তিনি ছাড়া আর কিছু নেই। হয় না। হবেও না! তাঁর মধ্যেই সমস্ত সৃষ্টি। আর সমস্ত সৃষ্টি তাঁকে ঘিরেই আবর্তিত। তিনি জন্মগ্রহণ করেননি! আবির্ভূত হয়েছেন। নররূপে লীলা করতে লৌকিক রূপ নিয়ে এসেছেন। তাই তো জন্মাষ্টমীর অবতারণা!

বৈকুন্ঠে তিনি লক্ষ্মীকে পাশে নিয়ে কমলাকান্ত নারায়ণ। নারায়ণ কে? নরসমূহ বা তাবৎ জীবকুল যাঁকে অয়ণ বা আশ্রয় করে আছে তিনিই নারায়ণ। তিনিই আবার ক্ষীরোদ সাগরে অনন্তশয্যায় শায়িত সর্বশক্তিমান ভগবান বিষ্ণু। কিন্তু বিষ্ণু কে? বিশাল রূপে বিস্তৃতি যাঁর তিনিই বিষ্ণু। আবার গোলোকে তিনিই শ্রীরাধার প্রাণধন শ্রীহরি। তিনিই পরমানন্দ মাধব সচ্চিদানন্দ পরমব্রহ্ম। তিনিই পরমাগতি। ত্রেতায় তিনি অযোধ্যানাথ পুরুষোত্তম মর্যাদাপুরুষ শ্রীরামচন্দ্র। দ্বাপরে তিনিই মথুরা, গোকুল, বৃন্দাবনে লীলাধর গোপাল। দ্বারকায় তিনি দ্বারকাধীশ অনাদির আদি গোবিন্দ। তিনিই আবার ধর্মসংস্থাপনকারী কুরুক্ষেত্র খ্যাত শ্রীকৃষ্ণ। আবার কলিতে নীলাচল পুরীতে তিনিই জীবন্ত বিগ্রহ হয়ে অবস্থান করছেন জগন্নাথ মহাপ্রভু রূপে। ভক্তের ভগবান সেই শঙ্খ চক্র গদা পদ্মধারী কোটিসূর্যসম অনন্ত মহাশক্তির সমুখে প্রণিপাত।।

