হলিউডি বাজেট নয়, বিশ্বাসের শক্তি—‘হনুমান অংশ’(Hanuman Ansh)-এর অপ্রত্যাশিত উত্থান
দেবপ্রিয়া বারিক: সিনিয়র রিপোর্টার: রঙ নিউজ
মাত্র কয়েক কোটি টাকার ছবির সামনে বড় তারকার ছবিও চাপে! নিম করোলি বাবার জীবন ও দর্শনকে কেন্দ্র করে বদলে যাচ্ছে ‘সাফল্য’-র সংজ্ঞা।
সিনেমার সাফল্যের পুরনো অঙ্কে বড় তারকা, বিশাল বাজেট, প্রচারের ঝলক—সবই যেন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ২০২৬-এর বক্স অফিসে সেই হিসাবেই যেন একটি প্রশ্নচিহ্ন বসিয়ে দিয়েছে ‘হনুমান অংশ’।
বিশাল চতুর্বেদী পরিচালিত এই হিন্দি জীবনীভিত্তিক ভক্তিমূলক নাটকটি ৭ আগস্ট ২০২৬-এ প্রেক্ষাগৃহে আসে। মুখ্য চরিত্রে শোভিনাও সত্যা অভিনয় করেছেন নিম করোলি বাবার ভূমিকায়। ছবিটির কেন্দ্রবিন্দু কোনও কাল্পনিক সুপারহিরো নয়; বরং আধ্যাত্মিক সাধক নিম করোলি বাবার জীবন, বিশ্বাস, মানবসেবা ও ভক্তির দর্শন।
শুরুটা ছিল নীরব, গল্পটা বদলাল ধীরে ধীরে
‘হনুমান অংশ’-এর সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক তার প্রথম দিনের সাফল্য নয়—বরং ধীরে ধীরে দর্শকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা।
প্রাথমিকভাবে ছবিটির শো ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু দর্শকের মুখে মুখে ছবিটির কথা ছড়াতে শুরু করার পর পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। যে ছবি শুরুতে বড় বাণিজ্যিক ছবির ছায়ায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ছিল, সেটিই পরবর্তী সময়ে বক্স অফিসের অন্যতম আলোচিত ‘স্লিপার হিট’ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ছবিটি ভারতে ১০০ কোটি টাকার গণ্ডিও অতিক্রম করেছে।
এখানেই ‘হনুমান অংশ’-এর আসল গল্প।
এটি শুধু একটি ছবির ব্যবসায়িক সাফল্য নয়; বরং দর্শক কী দেখতে চাইছেন, সেই প্রশ্নেরও একটি আকর্ষণীয় উত্তর।
নিম করোলি বাবা কেন সিনেমার কেন্দ্রে?
ছবিটি নিম করোলি বাবাকে শুধুমাত্র একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখানোর পরিবর্তে তাঁর সঙ্গে যুক্ত ভক্তি, সেবা, ভালোবাসা ও মানুষের পাশে থাকার দর্শনকে গল্পের ভিত তৈরি করেছে। ছবির কাহিনির সূত্রে এক শোকাহত শিশুর ঈশ্বর-অনুসন্ধান ধীরে ধীরে তাকে আত্মিক উপলব্ধি ও মানবসেবার পথে নিয়ে যায়।
এই জায়গাটিই ছবিটিকে প্রচলিত ধর্মীয় সিনেমা থেকে কিছুটা আলাদা করে।
কারণ এখানে প্রশ্নটি শুধু—‘ঈশ্বর কোথায়?’ নয়।
বরং আরও গভীর প্রশ্ন—
ঈশ্বরকে খুঁজতে গিয়ে মানুষকে কি মানুষের কাছেই ফিরে আসতে হয়?
‘হনুমান অংশ’ সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে ভক্তি ও সেবার মধ্য দিয়ে।
নায়ক হওয়ার গল্পটিও কম আশ্চর্যের নয়
ছবির প্রধান অভিনেতা শোভিনাও সত্যার কাস্টিংও হয়ে উঠেছে সিনেমাটির আলোচিত অধ্যায়। তিনি প্রথমে ছবিটির সহকারী পরিচালক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু মূল অভিনেতা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিচালক বিশাল চতুর্বেদী তাঁকে দীর্ঘ অডিশনের মাধ্যমে নিম করোলি বাবার চরিত্রের জন্য বেছে নেন।
অর্থাৎ পর্দার সামনে আসার আগে তিনি ছিলেন পর্দার পিছনের মানুষ।
এই অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনই ‘হনুমান অংশ’-এর গল্পকে আরও প্রতীকী করে তোলে—যে ছবির শুরু ছিল ছোট, তার পথই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে উঠেছে।
ছবির সাফল্যের আসল রহস্য কোথায়?
বক্স অফিসের সংখ্যার বাইরে ‘হনুমান অংশ’-কে বোঝার জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, বিষয়বস্তু।
আধ্যাত্মিকতা, বিশ্বাস এবং মানবসেবার মতো বিষয় ভারতীয় দর্শকের একটি বড় অংশের সঙ্গে সরাসরি আবেগের সম্পর্ক তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, প্রচারের বদলে দর্শকের প্রতিক্রিয়া।
ছবিটির ক্ষেত্রে ‘ওয়ার্ড অফ মাউথ’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে বলে একাধিক রিপোর্টে উঠে এসেছে।
তৃতীয়ত, তারকা-নির্ভরতার বাইরে যাওয়ার সাহস।
ছবিটিতে বড় বলিউড তারকার উপস্থিতি নেই। অথচ সেই সীমাবদ্ধতাই শেষ পর্যন্ত ছবিটির পরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবার দেশের সীমানা পেরোচ্ছে ‘হনুমান অংশ’
ভারতে সাফল্যের পর ছবিটির আন্তর্জাতিক মুক্তির প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে বিদেশের বাজারে ছবিটি মুক্তি পাওয়ার কথা, এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশনের দায়িত্ব নিয়েছে Hombale Films।
অর্থাৎ যে গল্পের শুরু হয়েছিল সীমিত পরিসরে, সেটিই এবার ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার একটি চলচ্চিত্রভাষা নিয়ে পৌঁছতে চলেছে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে।
‘হনুমান অংশ’-এর সাফল্যকে শুধু ১০০ কোটির হিসাব দিয়ে বিচার করলে ছবিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হয়তো অদৃশ্য থেকে যাবে।
এই সিনেমা মনে করিয়ে দিচ্ছে—
সিনেমার শক্তি সবসময় তার বাজেটে থাকে না। কখনও কখনও সেই শক্তি থাকে এমন একটি বিশ্বাসে, যার সঙ্গে দর্শক নিজের জীবনের কোনও অদৃশ্য অনুভূতিকে মিলিয়ে নিতে পারেন।
তাই ‘হনুমান অংশ’কে শুধুই একটি ধর্মীয় ছবি বলা হয়তো যথেষ্ট নয়।
এটি বরং বিশ্বাস, শোক, ঈশ্বরের অনুসন্ধান এবং মানুষের সেবা—এই চারটি অনুভূতিকে একসঙ্গে পর্দায় আনার একটি চলচ্চিত্র-পরীক্ষা।
