তসলিমার কলকাতায় পদার্পণ নতুন যুগের ঘোষনামাত্র
অমিত গোস্বামী, রঙ নিউজ
তসলিমার কলকাতাঃ
গতকাল ১ অগাস্ট লেখিকা তসলিমা নাসরিন কলকাতায় রবীন্দ্র সদনে বক্তৃতা দিলেন। ২০০৭ সালের ২১ নভেম্বর কলকাতা ছাড়ার প্রায় উনিশ বছর পরে। একে অনেকেই ঘরের মেয়ের ঘরে ফেরা হিসেবে দেখলেও বাস্তবে তসলিমার কলকাতাবাস ছিল তার নির্বাসিত জীবনে বেশ সংক্ষিপ্ত সময়। মাত্র সাড়ে তিন বছর। তিনি নিজ দেশ থেকে নির্বাসিত হয়েছেন ৩৪ বছরের বেশি। ১৯৯৪ সালের ৯ অগাস্ট তাকে ছদ্মবেশে বাংলাদেশ ত্যাগ। সেটাই তার বাংলাভাষী অঞ্চল থেকে নির্বাসনের শুরু।
হিন্দু নির্যাতন নিয়েঃ
প্রাচীন গল্প ফেঁদে লাভ নেই। তবে এ’টুকু বলা যায় যে ডাক্তারি ছাত্রী তসলিমা শুরু থেকে সংবাদপত্রে কলাম লিখে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন তার ঠোঁটকাটা বাক্যবর্ষণে। কবি রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহকে বিয়ে করে ও পরে বিচ্ছেদ দিয়ে সংবাদে ছিলেন। ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ার পরে বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। তখন সোশাল মিডিয়া ছিল না। টিভিও তত শক্তিশালী নয়। সদ্য সেনা শাসনমুক্ত বাংলাদেশ থেকে প্রিন্ট মিডিয়াতে খবর কম আসে।
তসলিমার ‘লজ্জা’ঃ
সেই সময় অর্থাৎ ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হল তসলিমা নাসরিনের উপন্যাস ‘লজ্জা’ যেখানে হিন্দু নির্যাতনের বর্ণনা ছিল খোলাখুলি। ফলে তসলিমা ক্ষমতায় থাকা জামাতী মৌলবাদীদের রোষানলে পড়লেন। কিন্তু বিষয়টা তীব্র হল ভারতের ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় ১৯৯৪ সালের মে’ মাসে তসলিমার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। সেখানে তসলিমা বললেন যে কোরান-এর কিছু আয়াত অচল, তাই পরিবর্তণ প্রয়োজন। ক্ষোভ তীব্র হল। তসলিমা এককথায় বোরকার আড়াল নিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন। চলে গেলেন সুইডেন।
ইওরোপে দশ বছরঃ
জাতিসঙ্ঘের সাহায্য ও আশ্রয়ে তার ইওরোপবাস শুরু। বাংলাভাষী বাঙালিদের সাথে থাকার প্রবল তাড়নায় ২০০৪ সালে তিনি ফিরলেন কলকাতায়। স্বল্পকালীন রেসিডেন্স পারমিট পেয়ে ডেরা বাঁধলেন ৭ নং রডন স্ট্রিটে। ভালই ছিলেন। ২০০৩ সালের শেষ লগ্নে প্রকাশিত হল তার ‘দ্বিখণ্ডিত’ বইটি। বইটি ব্যান করে দিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য’র সরকার। কেন? বিমান বসুর উক্তিতে যে বই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ণ করে তাকে চলতে দেওয়া ঠিক নয়। বইটির দুটি বিষয় নিয়ে আপত্তি উঠেছিল। প্রথমটি ইসলাম ধর্মে আরাধ্য নবীজির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু মন্তব্য ও দ্বিতীয়টি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বাংলাদেশের কবি সৈয়দ শামসুল হক ও মাসুদা ভাট্টির নারীপ্রিয়তা নিয়ে কিছু মন্তব্য।
কলকাতার তসলিমা তাড়াও তান্ডবঃ
এবারে রাস্তায় নামল অল ইন্ডিয়া মাইনরিটি ফোরাম যার সভাপতি ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ইদ্রিশ আলি যে প্রথমে কংগ্রেস ও পরে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ছিলেন। এমপি হয়েছেন, এমএলএ-ও হয়েছেন। ২০০৭ সালের নভেম্বরে এন্টালি, পার্ক সার্কাস, তপসিয়া অঞ্চলে শুরু হল তাদের হিংসাত্মক আন্দোলন। আমি নিজে তা দেখেছি। কন্যা পড়ত লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজে। ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা আটকে ছিল কলেজে। একই সময়ে ফুরফুরা শরীফের পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকী ফতোয়া দিলেন যদি তসলিমাকে কলকাতা থেকে না তাড়ানো হয় তা’হলে তার ফলভোগ করবে শাসক বামফ্রন্ট। বৃহত্তর আন্দোলনে যাবে মুসলিম সমাজ।
ভয় পেয়েছিলেন বুদ্ধদেবঃ
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদের ভট্টাচার্যকে নিয়ে অনেকে আজও শ্রদ্ধায় আপ্লুত। কিন্তু তার প্রশাসনিক অবস্থান যে কখনই কঠোর ছিল না সেটা তসলিমাকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করা ও পরে সিঙ্গুর আন্দোলনের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি। সদ্য ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন হয়েছে। ভয় পেলেন বৌদ্ধিক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। একজন লেখিকাকে কলকাতা থেকে নির্বাসিত করলেন কলকাতা থেকে। তখনকার লেখকরা বাম সরকারের ধামাধরা। তথাকথিত বুদ্ধিজীবিরাও। একটিও প্রতিবাদের কন্ঠ সে’দিন শোনা যায়নি।
ইউপিএ সরকারের বিমাতৃসুলভ আচরণঃ
কেন্দ্রে তখন ইউপিএ সরকার। তারা পড়লেন মহা ফাঁপরে। কলকাতা থেকে পাঠানো তসলিমাকে দিল্লিতে নয়, তারা পাচার করলেন রাজস্থানে। ২০০৭ সালে হায়দ্রাবাদে তসলিমার একটি বইপ্রকাশের অনুষ্ঠানে তীব্র তান্ডব করল আসাদউদ্দিন ওয়াইসির এআইএমআইএম। ব্যস, আর যায় কোথায়! দিল্লি ফিরে তসলিমা কার্যত ৭/৮ মাস কার্যত গৃহবন্দী হলেন যাকে হাউজ অ্যারেস্ট বলা যায়। সরকার তাকে ভারত ছাড়ার পরোক্ষ চাপ দিতে থাকল। রেসিডেন্স ভিসা নবায়নে শুরু হল টালবাহানা। কিন্তু নাহ, তসলিম দিল্লির বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চল ছাড়তে রাজি হন নি।
মোদীর বিরাট দমঃ
এভাবেই কাটল ৭ বছর। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এল বিজেপি। তার আগে ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে, যখন নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী সে’সময় গুজরাটের ভাবনগরের বোতাদ শহরে এক রাজনৈতিক জনসভায় বলেছিলেন – ‘”তসলিমা মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সত্য বলতে সাহস দেখিয়েছেন। কেন্দ্র সরকার যদি তাঁকে দেখে রাখতে না পারে, তবে তাঁকে গুজরাটে পাঠিয়ে দিন। গুজরাটের মানুষ এবং সরকার তাঁর দেখাশোনা করবে। তাঁকে সুরক্ষা দেওয়ার সাহস আমার আছে।”
তসলিমাকে নিয়ে মোদীর সিদ্ধান্তঃ
প্রধানমন্ত্রী হয়ে নরেন্দ্র মোদী তৎকালীন স্বরাস্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহকে দিয়ে তসলিমার বিষয়ে যা যা করলেন তা হল দীর্ঘমেয়াদী রেসিডেন্ট ভিসা পারমিট, স্থায়ী নিবাসের নিশ্চয়তা, ২৪ ঘন্টার সশস্ত্র নিরাপত্তা, সব জায়গায় এসকর্ট গাড়ি নিয়ে ঘোরার অনুমতি এবং অবস্থানের গোপনীয়তা। তসলিমা অবশ্যই কৃতজ্ঞ। কিন্তু এ’কথা তসলিমা বারেবারে বলেন যে কৃতজ্ঞতা মানে তা আনুগত্যের চুক্তি নয়। অর্থাৎ নিজের স্বাধীন সত্তা কোনভাবেই বিক্রয়যোগ্য নয়।
ঐতিহাসিক ভুলঃ
তসলিমাকে নিয়ে তাই কলকাতার উচ্ছ্বাস অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এ’কথা স্পষ্ট বলা ভালো যে দিল্লিতে তার অনেক সহজে পৌঁছনো যায়। কলকাতার বাঙালিদের কাছে গতকালের সম্বর্ধনা প্রথম নয়। গত ৮ মার্চ, ২০২৫ তারিখে দক্ষিন দিল্লির কালীবাড়ি প্রেক্ষাগৃহে প্রদীপ গুপ্ত’র নেতৃত্বে কলকাতা থেকে যাওয়া জনা পঁচিশ সাহিত্যানুরাগীদের দেওয়া সম্বর্ধনায় স্যোৎসাহে হাজির হন। অনেকটা সময় কাটান। নিরাপত্তার ঝামেলা বিশেষ ছিল না। সেখানে তিনি বলেন যে কলকাতার সাথে তার নাড়ির টান, তাই এসেছেন কলকাতার সাথে সময় কাটাতে। গতকালের কলকাতার অনুষ্ঠানে এ’হেন প্রদীপ গুপ্তকে আমন্ত্রণ না জানানো হয়ত একটা ‘ঐতিহাসিক ভুল’।
লেখক স্বাধীনতা মানে যা খুশি বলার লাইসেন্স নয়ঃ
মুখ্যমন্ত্রী গতকাল বলেছেন যে মুক্ত বঙ্গে তিনি যতবার খুশি আসুন, তার নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের। ঠিক। আজ পশ্চিমবঙ্গ আগেকার ভোটের ভয়ে ভীত কোন শাসকের অধীনস্থ নয়। কিন্তু সমাজের কাছে লেখক বা প্রবুদ্ধদের তাদের কাজের জবাবদিহিতার দায় থাকবেই। একই যুক্তিতে কোন ইসলাম ধর্মাবলম্বী বন্ধু বলতেই পারেন যে তা’হলে তো তসলিমার ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জবাবদিহিতার দায় থেকে যায়। নাহ, তিনি ইসলাম ধর্মে আধুনিকতার আহ্বান করেছিলেন মাত্র। ত্রিশুলের মাথায় কনডোম পড়ান নি বা আরো কিছু বাক্যবর্ষণ করেন নি যা ধর্মবিশ্বাসীদের অনুভুতিতে অযৌক্তিক আঘাত করে। লেখকের স্বাধীনতা অবশ্যই সমর্থণযোগ্য তবে যা খুশি বলার স্বাধীনতা তাকে কেউ দেয় নি।
বিতর্ক থাক, আসুন, বসি একাসনেঃ
এ’কথা অনস্বীকার্য যে নারী স্বাধীনতার ও লেখক সত্তার পূর্ণ প্রকাশের প্রতীক তসলিমা নাসরিন। তার কলকাতা আসাও মুক্তমনা কলকাতার বর্তমান অবস্থার সঠিক বিজ্ঞাপন। কিন্তু এতেই যেন শেষ না হয়! পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আজও প্রকৃত শিক্ষার থেকে বেশ দূরেই আছেন। আধুনিক শিক্ষায় তারা যতদিন শিক্ষিত হয়ে বাকিদের টেনে আনবেন ততদিন বর্তমান সরকারের কাজ সম্পূর্ণ হবে না। কারণ আমার দেশ – এক নিশান, এক বিধান ও এক প্রধান-এ বিশ্বাসী। অনেক তো হল, এবার ইজম চুলোয় যাক, দলবাজি বাদ দিন, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সবাই বসুক একাসনে।
সাব এডিটর – অনুরাধা ভট্টাচার্য্য শর্মা, সোমনাথ মুখোপাধ্যায় , প্রতীক চ্যাটার্জী
এডিটর – দিব্যেন্দু দাস
এডিটর ইন চিফ – ড: রাকেশ শর্মা
