দুধের সাদা রঙের আড়ালে ‘কালো’ কারবার!

দুধের সাদা রঙের আড়ালে ‘কালো’ কারবার!

দেবপ্রিয়া বারিক: সিনিয়র রিপোর্টার: রঙ নিউজ

 

মুম্বাই : মহারাষ্ট্রে সিন্থেটিক দুধের ভয়াবহ চক্রের হদিশ, তদন্তে উঠে এল ২.৩ কোটি লিটারের সন্দেহ

সাদা রঙ, পরিচিত স্বাদ—দেখলে দুধ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সাদার আড়ালেই যদি থাকে ডিটারজেন্ট, পাম অয়েল আর নিম্নমানের রাসায়নিক, তাহলে তা শুধু ভেজাল নয়—সরাসরি জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন। মহারাষ্ট্রের ধারাশিব জেলার ভূম তালুকায় পুলিশ ও Food and Drug Administration (FDA)-এর যৌথ তদন্তে এমনই এক বড়সড় দুধ ভেজাল চক্রের সন্ধান মিলেছে।

কীভাবে সামনে এল চক্র?

তদন্তকারীরা অভিযুক্তদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া বিক্রির রেজিস্টার ও নথি পরীক্ষা করে দেখেন, গত প্রায় ছয় মাসে প্রায় ২,৩০,৪৭০ কেজি নিম্নমানের মিল্ক পাউডার ভেজাল তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে হিসাব পাওয়া যাচ্ছে।

তদন্ত অনুযায়ী, ওই উপকরণ থেকে আনুমানিক ২৩,০৪,০৭০ লিটার সিন্থেটিক বা কৃত্রিম দুধ তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। এর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৯ কোটি ২১ লক্ষ ৬২ হাজার ৮০০ টাকা।

আরও ভয়ঙ্কর তথ্য—১০০ লিটারে ১০ লিটার!

তদন্তে উঠে এসেছে চক্রটির কথিত পদ্ধতিও। অভিযোগ, প্রতি ১০০ লিটার আসল দুধের সঙ্গে প্রায় ১০ লিটার সিন্থেটিক দুধ মেশানো হতো—অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশ ভেজাল।

এই হিসাব এবং ভূম এলাকার দুধ সংগ্রহকেন্দ্রগুলির মাধ্যমে সরবরাহের তথ্য মিলিয়ে তদন্তকারীদের আশঙ্কা, গত ছয় মাসে ২.৩ কোটিরও বেশি লিটার ভেজাল দুধ মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে থাকতে পারে। তবে এটি এখনও তদন্তাধীন একটি আনুমানিক হিসাব।

দুধকে ‘দুধের মতো’ বানানোর অভিযোগ

তদন্ত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম দুধকে দেখতে ও গুণগত বৈশিষ্ট্যে আসল দুধের কাছাকাছি দেখাতে ডিটারজেন্ট পাউডার, পাম অয়েল এবং নিম্নমানের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। লক্ষ্য ছিল দুধের চেহারা ও ফ্যাটের বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করা।

অভিযান চলাকালীন ৬১ ব্যাগ ভেজাল মিল্ক পাউডার উদ্ধারের কথাও পুলিশ সূত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই উপকরণ বিভিন্ন ডেয়ারি ইউনিটে সরবরাহ করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ।

সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্তে SIT

এই ঘটনায় সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অভিযুক্তদের কয়েকজন/সকলেই তখনও পলাতক।তাঁদের সন্ধানে Special Investigation Team (SIT) গঠনের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। তদন্তকারীরা শুধু উৎপাদনস্থল নয়, দুধ সংগ্রহকেন্দ্র এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলের আরও সংযোগ খতিয়ে দেখছেন।

রাজ্যজুড়ে FDA-র কড়া অভিযান

এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনও অভিযান নয়। মহারাষ্ট্র FDA-র নেতৃত্বে ২০২৬ সালে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে রাজ্যজুড়ে নজরদারি ও অভিযান জোরদার হয়েছে। সংস্থাটির সরকারি ওয়েবসাইটে তাদের মূল লক্ষ্য হিসেবে “Safe Food, Safe Drugs, Safe Maharashtra” উল্লেখ করা হয়েছে। FDA জানায়, খাদ্যপণ্যের মান, নিরাপত্তা ও আইন মেনে চলা নিশ্চিত করাই তাদের দায়িত্ব।

FDA-র নিয়ম অনুযায়ী, Food Safety Officer সন্দেহজনক খাদ্য বা ভেজাল উপাদান তল্লাশি করে বাজেয়াপ্ত করতে পারেন।

শুধু দুধ নয়, নজরে গোটা খাদ্যশৃঙ্খল

মহারাষ্ট্রে চলা এই অভিযানে ডেয়ারি, প্রস্তুতকারক, পাইকার, পরিবেশক ও খুচরো বিক্রেতাদের উপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। জুলাই মাসে রাজ্যজুড়ে অন্য একটি অভিযানে FDA ১,৭০০ লিটারেরও বেশি দুধ বাজেয়াপ্ত এবং বেশ কিছু খাদ্য প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দুধের উৎস কতটা নিরাপদ?

এই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু কত লিটার ভেজাল দুধ তৈরি হয়েছিল তা নয়। আসল প্রশ্ন হল—কোথা থেকে উপকরণ এল, কারা তা সংগ্রহ করল, কোন কোন সংগ্রহকেন্দ্রে মেশানো হল এবং কোন পথে তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছল?

তদন্তকারীরা সেই সরবরাহ-শৃঙ্খলের সূত্র খুঁজছেন। কারণ, এটি একটি দুধের প্যাকেটের সমস্যা বা শুধু একটি পরিবারের খাবারের সমস্যা নয়—তা হাজার হাজার পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *