সীমান্তে চীনের সঙ্গে ভারতের ‘নাম-যুদ্ধ’-এর জবাব দিল দিল্লি

সীমান্তে চীনের সঙ্গে ভারতের ‘নাম-যুদ্ধ’-এর জবাব দিল দিল্লি
দেবপ্রিয়া বারিক : সিনিয়র রিপোর্টার ‌: রঙ নিউজ

নয়াদিল্লি, ৮ আগস্ট : অরুণাচলের সরকারি মানচিত্রে ২৭ স্থান আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি—তালিকায় স্থান পেল।১৯৫৯-এর সীমান্ত-উত্তেজনার Longju, ১৯৬২-র যুদ্ধের Thag La-ও আনুষ্ঠানিক ভাবে যুক্ত হল ভারতের মানচিত্রে।
সীমান্তে শুধু পাহাড়, নদী আর রাস্তা নয়—এবার মানচিত্রের পাতাতেও স্পষ্ট হচ্ছে ভারত-চিনের ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন। চিন বারবার অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন জায়গার নতুন নাম ঘোষণা করে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে আসার মধ্যেই ভারত সরকার অরুণাচল প্রদেশের ২৭টি স্থান ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যকে Survey of India-এর সরকারি মানচিত্রে তাদের standard name-সহ আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করেছে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে অরুণাচল প্রদেশ সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেই।


মানচিত্রে এবার স্পষ্ট ২৭টি নাম
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, তালিকায় রয়েছে ২১টি স্থলভাগ, চারটি গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথ, একটি হ্রদ এবং একটি স্মারক। ২১টি স্থানের মধ্যে রয়েছে—Longju, Maja, Bisa, Bara Kundun, Chhota Kundun, Dhan Bari, Pritnagar, Buddhamandir, Jairampur, Teritnagar, Ramnagar, Jaswant Garh, Sagar, Padma, Jyotinagar, Baisakhi, Chhota Ropuk, Bara Ropuk, Shivaji Nagar, Sunpura এবং Kamlang Nagar।
চারটি গিরিপথ হল Dzo La, Riza La, Pukur La এবং Thag La। তালিকায় রয়েছে উচ্চভূমির Sambho Sarovar এবং ১৯৬২ সালের যুদ্ধের স্মৃতিবাহী Sher-e-Thapa Memorial-ও।


কেন গুরুত্বপূর্ণ Longju ও Thag La?
এই তালিকার গুরুত্ব শুধু প্রশাসনিক নয়, ইতিহাস ও সীমান্ত-নিরাপত্তার দিক থেকেও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
Longju ভারত-চিন সীমান্তের অন্যতম পুরনো উত্তেজনাপূর্ণ এলাকা। সংবাদসূত্র অনুযায়ী, ১৯৫৯ সালে সেখানে চিনা বাহিনীর প্রবেশ সীমান্ত-সংঘাতের অন্যতম প্রাথমিক ফ্ল্যাশপয়েন্ট হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে Thag La ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষস্থলগুলির একটি।
তালিকায় থাকা Jaswant Garh-এর সঙ্গেও ১৯৬২ সালের যুদ্ধের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। এটি তাওয়াং যাওয়ার পথে যুদ্ধবীর Jaswant Singh Rawat-এর স্মৃতিসৌধের সঙ্গে যুক্ত। একইভাবে Sher-e-Thapa Memorial ১৯৬২ সালের যুদ্ধের আরেক বীর Trilok Singh Thapa-র স্মৃতি বহন করে।


কী বলছে কেন্দ্র?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য কোনও নতুন ভূখণ্ড দাবি করা নয়; বরং সরকারি মানচিত্রে সংশ্লিষ্ট স্থানগুলিকে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো। সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, Survey of India-এর মানচিত্রে স্থানগুলির আনুষ্ঠানিক অবস্থান ও standard name যুক্ত করার ফলে তাদের সঠিক পরিচিতি আরও স্পষ্ট হবে।
সরকারি মানচিত্রে কোনও স্থান স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত থাকার প্রশাসনিক গুরুত্বও রয়েছে। সংবাদসূত্রের সরকারি-সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই ধরনের ম্যাপিং ভবিষ্যতে ভূমি ও রাজস্ব নথি, জনগণনা, পরিকাঠামো পরিকল্পনা এবং সীমান্ত-সড়ক নির্মাণের মতো প্রশাসনিক কাজে স্থানগুলিকে আরও নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারে।
পেছনে চীনের ধারাবাহিক ‘নাম বদল’
অরুণাচল নিয়ে ভারত-চিনের বিরোধ নতুন নয়। চীন অরুণাচল প্রদেশকে ‘Zangnan’ বা ‘South Tibet’ হিসেবে দাবি করে এবং বিভিন্ন সময়ে সেখানে থাকা স্থানগুলির তথাকথিত ‘standardised’ নাম প্রকাশ করেছে। ভারত বরাবরই এই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।
চিন ২০১৭ সালে প্রথম ছয়টি স্থান, ২০২১ সালে ১৫টি এবং ২০২৩ সালে আরও ১১টি স্থানের নাম পরিবর্তনের তালিকা প্রকাশ করেছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিলেও চিন অরুণাচলের ২৩টি স্থানের নাম প্রকাশ করে। সেই সময় ভারতের বিদেশ মন্ত্রক স্পষ্ট জানিয়েছিল, এ ধরনের ‘কাল্পনিক’ নামকরণ বাস্তব পরিস্থিতি বা ভারতের সার্বভৌম অবস্থান বদলাতে পারে না।
মানচিত্রেও থাকবে ভারতের নথি
ফলে ২০২৬ সালের এই পদক্ষেপকে শুধু ২৭টি নাম মানচিত্রে বসানোর প্রশাসনিক কাজ হিসেবে দেখলে বিষয়টির কৌশলগত গুরুত্ব পুরোপুরি ধরা পড়বে না। চীন যেখানে নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজের দাবির রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে, ভারত সেখানে নিজের সরকারি মানচিত্র ও নথিতে সংশ্লিষ্ট স্থানগুলিকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করছে।
তবে এটিও পরিষ্কার রাখা জরুরি—এই পদক্ষেপে নতুন করে কোনও ভূখণ্ড ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা বা সীমানা পরিবর্তন করা হয়নি। অরুণাচল প্রদেশের ওপর ভারতের অবস্থান আগের মতোই রয়েছে; নতুন সিদ্ধান্তের মূল বিষয় হল সরকারি মানচিত্রে ২৭টি স্থান ও বৈশিষ্ট্যের আনুষ্ঠানিক, standard-name ভিত্তিক নথিভুক্তি করা হয়েছে।
এখন সীমান্তে লড়াই শুধু মাটিতে নয়—মানচিত্রের পাতাতেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *