যেখানে বসে লেখা হয় বন্দে মাতরম 

যেখানে বসে লেখা হয় বন্দে মাতরম

 

✍🏾সোমনাথ মুখোপাধ্যায়:Rong News

 

নামে কি এসে যায়! বলেছিলেন উইলিয়াম শেক্সপিয়ার। সত্যিই তো। গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন গোলাপ তো এ গোলাপই থাকে! তার মাধুর্য, তার মিষ্টি সুবাস, তার আভিজাত্যপূর্ণ উপস্থিতিই তার পরিচয়। ঠিক তেমনি শহর কলকাতা থেকে অনতিদূরে হুগলি জেলায় একেবারে গঙ্গার ধারে প্রাচীন শহর চুঁচুড়ার বুকে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নামাঙ্কিত ও তাঁর পদধূলিধন্য ‘বঙ্কিম ভবন।’ অপর নাম ‘বন্দে মাতরম ভবন।’ শুধু চুঁচুড়াবাসী নয় সমস্ত রাজ্যবাসীর কাছে বর্তমানে এই বাড়িটি জাদুঘর হিসাবে পরিচিত। কথিত আছে এই বাড়িটিতে বসেই তাঁর সুবিখ্যাত বন্দে মাতরম সংগীতটি লিখেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যদিও বন্দে মাতরম লেখার সময়কাল নিয়ে মতভেদ আছে। তবুও যেটুকু সূত্র মারফত জানা যায়, এই সংগীতটি রচনা করার কথা বঙ্কিমচন্দ্র ভেবেছিলেন ১৮৭০ থেকে ১৮৭৬ সালের মধ্যে।সন্ন্যাসী বিদ্রোহ তথা বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রামাণ্য দলিল তাঁর লেখা সুবিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠে বন্দে মাতরম গানটি রয়েছে। আনন্দমঠের প্রকাশকাল ১৮৮২। সেক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে ওই সালে গানটি লেখা হয়।সূত্রের দাবি, গানটি রচনা করার পর প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী যদুভট্টকে গানটিতে সুরারোপ করতে অনুরোধ করেন বঙ্কিমচন্দ্র।

ফিরে আসা যাক বঙ্কিম ভবন বা বন্দে মাতরম ভবনে। গঙ্গার অপর পাড়ে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নৈহাটির কাঁঠালপাড়ায় তাঁর পৈত্রিক বাসস্থান হলেও তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী হিসাবে উত্তরবঙ্গ, মেদিনীপুর সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসনিক কাজ করে বেরিয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র। স্যার যদুনাথ সরকারের সঙ্গে যুগ্মভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সসম্মানে বি এ পাশ করে বেরুনো বাঙালির মধ্যে প্রথম গ্র্যাজুয়েট বঙ্কিমচন্দ্র এই বাড়িটি কিনেছিলেন জনৈক কাশেম মল্লিকের থেকে। সে সময় তিনি ছিলেন হুগলির মহকুমা শাসক। হুগলির জেলা সদর চুঁচুড়া সে সময় ছিল ডাচ কলোনি বা ওলন্দাজ উপনিবেশ। একেবারে গঙ্গার ধার ঘেঁষে গড়ে ওঠা বাড়িটি ডাচ স্থাপত্য শৈলীর বৈশিষ্ট্য বহন করছে। বাড়িটির চুন বালির কারুকার্য, স্তম্ভের গঠন, ওপরতলার লিন্টেল, দোতলার টেরেস, কার্নিশ, পাতার নকশা, কাঠের জাফরির বায়ু চলাচল, আর্চ যুক্ত প্রবেশপথ ডাচ শিল্পের পথ অনুসরণ করে। পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন বাড়িটির প্রবেশপথে ঢুকেই সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের একটি আবক্ষমূর্তি চোখে পড়ে। চোখে পড়ে এই বাড়িটির ইতিহাস তুলে ধরার প্রচেষ্টায় লেখা একটি মার্বেল ফলক। ভিতরে বেশ কয়েকটি ঘর। ঘরের দেওয়ালে বিভিন্ন তৈলচিত্র শোভা পাচ্ছে। এছাড়াও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের কিছু প্রামাণ্য চিত্র দেওয়ালগুলিতে স্থান পেয়েছে। বর্তমানে এই বাড়িটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অধিগৃহীত। বহু মানুষ এখানে আসেন। আর স্তব্ধবাক মুগ্ধতায় যেন নতজানু হন বাড়িটির নীরব গাম্ভীর্যের কাছে, তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের কাছে, বঙ্কিমের আভিজাত্যপূর্ণ, শক্তিশালী, ক্ষুরধার কলমের কাছে।

 

কালের নিয়মে সাহিত্য সম্রাট নেই। নেই ব্রিটিশ রাজত্ব। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম আজ ঠাঁই নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। তবুও আজও এই বাড়িটির চৌহদ্দিতে পা রাখলে অনুভবী বীক্ষণে ধরা পড়ে সাহিত্য সম্রাটের কলম হাতে একাগ সাধনা। শোনা যায় সন্তান দলের দেশমাতৃকার পরাধীনতার শৃংখল মুক্ত করার দাবি নিয়ে প্রাণ উৎসর্গ করার উদগ্র বাসনায় অস্ত্রের ঝনঝনানির। অন্তরাত্মা নাড়া দিয়ে যাওয়া বন্দে মাতরমের সেই আকুল আহবান।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *