সদগুরু সন্তদাস কাঠিয়াবাবা 

সদগুরু সন্তদাস কাঠিয়াবাবা

 

✍🏾সোমনাথ মুখোপাধ্যায়: Rong News

 

কথায় বলে ‘গুরু মিলে লাখ লাখ শিষ্য মিলে এক!’ অর্থাৎ সদগুরু তো অনেক পাওয়া যায় কিন্তু তেমন প্রকৃত শিষ্য মেলা কঠিন। তপোভূমি ভারতবর্ষের অন্যতম সদগুরু নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের মহান বৈষ্ণব সাধক ব্রজবিদেহী মোহন্ত রামদাস কাঠিয়াবাবার সাক্ষাৎ শিষ্য সন্তদাস কাঠিয়াবাবা ছিলেন তেমনই এক প্রকৃত শিষ্য। ১৮৫৯ সালের ১০ই জুন দশহরার দিন অবিভক্ত বাংলার শ্রীহট্ট জেলার বামৈতে জন্ম নেওয়া কলকাতা হাইকোর্টের খ্যাতনামা আইনজীবী তারাকিশোর চৌধুরি থেকে কঠোর তপস্যার মধ্যে দিয়ে যিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন সন্তদাস বাবাজি মহারাজ রূপে।

কেমন ছিল সেই অত্যাশ্চর্য ঘটনা তা জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৮৮৩ সালে। কৃতিত্বের সঙ্গে আইনের পাঠ শেষ করে ওকালতি পেশায় এলেন দর্শনে স্নাতকোত্তর প্রেসিডেন্সি কলেজের কৃতি ছাত্র তরুণ আইনজীবী তারাকিশোর চৌধুরি। ছাত্র জীবনে ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি আকর্ষণ থাকলেও জন্ম জন্মান্তরের সুকৃতি ও সুসংস্কার তারাকিশোরকে টেনে আনল সনাতন ভারতের আধ্যাত্মিকতার পথে। একদিকে নিষ্ঠার সঙ্গে মামলার কাজ। সওয়াল জবাব। অন্যদিকে ধ্যান, জপ, সাধন ভজন। ঈশ্বরকে জানার তীব্র আকুলতা। এর মধ্যেই ঘটে গেল এক অদ্ভুত কান্ড। জগন্নাথ ঘাটে নিত্য গঙ্গাস্নানের সময় গঙ্গার উৎস গোমুখের সঙ্গে সাক্ষাৎ হরপার্বতীর দর্শন পান তারাকিশোর! মনে এক প্রবল আলোড়ন।সদগুরু লাভের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে প্রার্থনা। এরপর কুম্ভ মেলায় গিয়ে রামদাস কাঠিয়াবাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং তাঁকেই গুরু হিসাবে বরণ করেন তারাকিশোর। কিন্তু প্রথম দেখাতেই তাঁকে শিষ্য বলে মেনে নিলেও মন্ত্র দীক্ষা দিলেন না রামদাস কাঠিয়াবাবা! আসলে শুভ মুহুর্ত না এলে যে তা হওয়ার নয়! তবে দ্রুত এসে গেল সেই শুভক্ষণ। কলকাতার বাসভবনে সূক্ষ্ম দেহে উপস্থিত হয়ে তারাকিশোরকে দীক্ষা দেন রামদাস কাঠিয়াবাবা!

শুরু হলো তারাকিশোর চৌধুরির অধ্যাত্ম জীবন। নিত্য জপ, ধ্যানে নিমগ্ন নবীন সাধক। সঙ্গে আইনি পেশা চলছে। পেশার চাপে একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লেন তারাকিশোর। ডাক্তারের চিকিৎসায় কোনোও লাভ হচ্ছে না দেখে কল্কেতে গাঁজা সেজে গুরু রামদাসকে নিবেদন করলেন তারাকিশোর। তবে অনভ্যস্ত বলে কল্কেতে আগুন দিতে পারলেন না তিনি। গুরুর ছবির সামনে গাঁজা নিবেদন করে ধ্যানে বসলেন তারাকিশোর। তাঁকে আশ্চর্য করে ধোঁয়া উঠতে শুরু করল আগুন বিহীন কল্কে থেকে! সেটি প্রসাদ হিসাবে গ্রহণ করে দ্রুত আরোগ্য লাভ করেন তারাকিশোর।

এসে গেল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে মধু বৃন্দাবনে গুরুর চরণাশ্রয়ে। বকেয়া মামলার নিষ্পত্তি করে, হাইকোর্টে বার লাইব্রেরিতে সহকর্মী আইনজীবীদের বিদায় জানালেন। আবেগে আপ্লুত হয়ে তারাকিশোরের পদধূলি গ্রহণ করলেন প্রখ্যাত আইনজীবী রাসবিহারী ঘোষ। বসত বাড়ি বিক্রির অর্থ সকলের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে সস্ত্রীক পথে নামলেন তারাকিশোর চৌধুরি। এমনই অবস্থা যে রেলের ভাড়াটুকুও সঙ্গে নেই! তাই তো হবে! তাঁর কাছে যেতে হলে তো শূন্য হয়ে, রিক্ত হয়েই যেতে হবে!

 

গুরু রামদাস কাঠিয়াবাবার পদপ্রান্তে বসে কঠোর তপস্যায় দ্রুত সিদ্ধিলাভ করে ফেলে তারাকিশোর চৌধুরি হয়ে উঠলেন সন্তদাস কাঠিয়াবাবা। গুরুর নির্দেশে পরিব্রাজক হিসাবে দর্শন করলেন বহু তীর্থ। দেবীতীর্থ জ্বালামুখীতে ধ্যান জপের পর পুজোর সময় তাঁর হাত থেকে অনির্বাণ অগ্নিশিখা স্বয়ং আদ্যাশক্তি মহামায়া প্রসাদী মিষ্টি গ্রহণ করেন! পরবর্তীতে বহু শিষ্য, ভক্তের আধ্যাত্মিক পথ প্রদর্শক হয়ে সদগুরু হয়ে উঠলেন ব্রজবিদেহী মোহন্ত শ্রী শ্রী ১০৮ সন্তদাস কাঠিয়াবাবা মহারাজ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *