স্যালুট তোমাকে, শিরীষা
শাশ্বতী মোদক | রঙ নিউজ
কিছু দরজা তালাবন্ধ থাকে চাবির অভাবে নয়, পুরনো মানসিকতার কারণে। আর সেই বন্ধ দরজায় সাহসের ধাক্কা দিয়ে ইতিহাস তৈরি করেছেন তেলেঙ্গানার সিদ্ধিপেটের মেয়ে বব্বুরি শিরীষা।
ছোটবেলা থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল শিরীষার। সরকারি চাকরির লক্ষ্যে মামার পরামর্শে তিনি ITI-তে Electrician Trade-এ প্রশিক্ষণ নেন। ২০১৯ সালে TSSPDCL-এর Junior Lineman পদে আবেদন করতে গিয়ে জানতে পারেন, এই নিয়োগে মহিলাদের আবেদন করার সুযোগ নেই। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, এই কাজের জন্য বিদ্যুতের খুঁটিতে উঠতে হয় এবং মহিলারা সেই কাজ করতে পারবেন না।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি শিরীষা। ভি. ভারতীর সঙ্গে তিনি নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর হাইকোর্ট তাঁদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়।
এরপর সামনে আসে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ—Pole Climbing Test। প্রায় ৮ মিটার উঁচু বিদ্যুতের খুঁটিতে উঠে আবার নিরাপদে নেমে আসতে হবে। যে কাজকে একসময় ‘মেয়েদের পক্ষে অসম্ভব’ বলে মনে করা হয়েছিল, সেটিই করে দেখান শিরীষা।
২০২০ সালের ২৩ ডিসেম্বর শিরীষা ও ভি. ভারতী সফলভাবে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। শিরীষা অসাধারণ দক্ষতায় এক মিনিটেরও কম সময়ে খুঁটিতে ওঠা-নামার পরীক্ষা সম্পন্ন করেন।
তবে লড়াই তখনও শেষ হয়নি। আইনি লড়াই, লিখিত পরীক্ষা এবং শারীরিক পরীক্ষার একের পর এক বাধা পেরিয়ে অবশেষে ২০২২ সালের মে মাসে শিরীষার হাতে আসে TSSPDCL-এর নিয়োগপত্র। তিনি হয়ে ওঠেন তেলেঙ্গানার প্রথম মহিলা Junior Lineman।
শিরীষার সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসাও। তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর মা সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তাই চাকরি পাওয়ার পর তাঁর সবচেয়ে বড় ইচ্ছা ছিল—এবার যেন তাঁর মাকে আর পরিশ্রম করতে না হয়।
শিরীষার গল্প শুধুমাত্র একটি সরকারি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়। এটি সেই প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জবাব, যা বলে—‘এটা মেয়েদের কাজ নয়।’ তাঁর সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে, কোনও পেশার যোগ্যতা লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না; সুযোগ পেলে দক্ষতা ও পরিশ্রম দিয়েই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করা যায়।
শিরীষার বার্তা তাই স্পষ্ট—“সুযোগ দিন, তারপর যোগ্যতা দিয়ে বিচার করুন।”
আজ তাঁর গল্প হাজার হাজার মেয়ের কাছে অনুপ্রেরণা। যে মেয়ে বিদ্যুতের খুঁটির চূড়ায় উঠে শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণ করেননি, বরং বহু মেয়ের জন্য একটি নতুন পথ খুলে দিয়েছেন, সেই বব্বুরি শিরীষাকে সত্যিই স্যালুট।
স্বপ্ন দেখুন, লড়াই করুন। আর দরজা বন্ধ থাকলে—প্রয়োজনে দরজাটাই বদলে দিন।
