অনির্বান অগ্নিশিখা দেবী জ্বালামুখী
✍🏾সোমনাথ মুখোপাধ্যায়:Rong News
অনির্বাণ অগ্নিশিখায় জাগ্রত তীর্থ দেবী জ্বালামুখী। স্থানীয় ভাষায় দেবী জ্বালাজি। উত্তর ভারতের হিমাচল প্রদেশের কাংড়া উপত্যকায় অবস্থিত ৫১ সতীপীঠের অন্যতম দেবী জ্বালামুখীতে অনন্ত কাল ধরে একভাবে পাহাড়ের ফাটল থেকে বেরিয়ে আসে নীলাভ ও শান্ত এক অনির্বান অগ্নিশিখা। এই অগ্নিশিখা কখনো নেভে না। ঘটে জল নিয়ে এই অগ্নিশিখায় ধরলে জলের ওপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে জ্বলতে থাকে আগুনের শিখা। যুগ যুগ ধরে এই আশ্চর্য ও প্রসিদ্ধ তীর্থ দর্শনে এসেছেন সাধকরা। আসেন অগণিত মানুষ। এই অগ্নিশিখাই সাক্ষাৎ পরমা প্রকৃতি আদ্যাশক্তি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০০০ ফুট উচ্চতায় অনুপম কারুকাজ সম্বলিত পাঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের দান করা সোনায় মোড়া মন্দিরের চূড়া, রঞ্জিত সিংয়ের পুত্র খড়গ সিংয়ের দান করা রূপোর দরজা পার হয়ে দর্শন মেলে দেবী জ্বালামুখীর। দেবীর সঙ্গে রয়েছেন তাঁর ভৈরব উন্মত্ত। মতান্তরে অম্বিকেশ্বর শিব।
ইতিহাসের কথায় আসা যাক। কৌতুহলী হয়ে একবার জ্বালামুখীতে আসেন তৎকালীন তামাম হিন্দুস্তানের একচ্ছত্র অধিপতি বাদশা আকবর। চামড়ার মশকে করে ভিস্তিওয়ালাদের দিয়ে জল ঢেলে নিভিয়ে দিতে চাইলেন আগুনের শিখা। চরম বিফল হলেন তিনি। এরপর লোহার চাদরে ঢেকে দিলেন অগ্নিশিখার উৎস মুখ। লোহার চাদর ভেদ করে বেরিয়ে এল আগুনের ফলা। অপার শ্রদ্ধায় মাথা নত করে সোনার ছাতা দিয়ে দেবী জ্বালামুখীর পুজো দিলেন বাদশা আকবর। পরবর্তীতে দেবী জ্বালামুখীর কথা তাঁর আত্মজীবনী তুজুক ই জাহাঙ্গীরিতে বর্ণনা করেছেন বাদশা জাহাঙ্গীর।
ফিরে আসা যাক পৌরাণিক উপাখ্যানে। কথিত আছে যে দক্ষের সভায় সতীর দেহত্যাগের পর তাঁর দেহ নিয়ে ত্রিলোকে তান্ডব করেন শোকার্ত দেবাদিদেব মহাদেব। তখন বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে খন্ডিত সতীর জিভ পড়ে এখানে। সেই জিভেরই প্রতীকী রূপ অনির্বান অগ্নিশিখা জ্বালামুখী। দেবীর কোনোও বিগ্রহ নেই। জ্বালামুখী মায়ের কল্পরূপই হলো অনির্বান নীলাভ লেলিহান অগ্নিশিখা। পীঠ নির্ণয় তন্ত্রে ৫১ সতীপীঠের উল্লেখযোগ্য পীঠ দেবী জ্বালামুখী। প্রাণতোষিণী তন্ত্রে উল্লিখিত-
‘হিঙ্গুলা চ মহাপীঠং তথা জালন্ধর পুতঃ, জ্বালামুখী মহাপীঠং পীঠং নাগরসম্ভব।’ প্রতিদিন মূল মন্দিরে পুজোর পর রাতে ‘সেজা ভবনে’ শয়ন দেওয়া হয় দেবী জ্বালামুখীকে।

তবে শুধুমাত্র একটিই নয় বরং দেবী দর্শন করলে দেখা যায় যে আরও আটটি সহ মোট নয়টি অগ্নিশিখায় সুশোভিত দেবী জ্বালামুখী মন্দির। সবথেকে বড়ো জ্যোতির্ময় অগ্নিশিখাটি হলেন পূর্ণব্রহ্মজ্যোতি দেবী জ্বালামুখী, দ্বিতীয়টি অন্নপ্রদায়িনী দেবী অন্নপূর্ণা, তৃতীয়টি শত্রুবিনাশকারিণী দেবী চন্ডী, চতুর্থটি ব্যাধিনাশকারিণী দেবী হিংলাজ, পঞ্চমটি শোকনিবারণী দেবী বিন্ধ্যবাসিনী, ষষ্ঠটি ধনদেবী মহালক্ষ্মী, সপ্তমটি বিদ্যাদেবী মহাসরস্বতী, অষ্টমটি সন্তান সুখদায়িনী দেবী অম্বিকা এবং নবম অগ্নিশিখা হলেন আয়ু, আরোগ্য ও সুখপ্রদায়িণী দেবী অঞ্জনা। দেবী জ্বালামুখী মন্দিরের আর একটি আশ্চর্য স্থান গোরখ ডিব্বা। নাথ যোগীদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাযোগী গোরখনাথের সাধন আসন এই গোরখ ডিব্বা যেখানে ফুটন্ত জল স্পর্শ করলে তা ঠান্ডা বলে অনুভব করেন মানুষ। এছাড়াও উন্মত্ত ভৈরবের মন্দির, ভূমিকম্পে হেলে যাওয়া রাধাকৃষ্ণের ‘টেড়া’ মন্দির, চোদ্দভূজা দুর্গা, লাল গণেশ, কালভৈরব দর্শন করেন অসংখ্য পুণ্যার্থীরা।
