আদিগুরু ব্যাসদেবের আবির্ভাব তিথিই গুরু পূর্ণিমা 

আদিগুরু ব্যাসদেবের আবির্ভাব তিথিই গুরু পূর্ণিমা

 

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়:Rong News

 

সে কতদিন আগের কথা। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে তেজোদীপ্ত চেহারার এক সাধক। পরনে গৈরিক বসন। উদ্দেশ্য নদী পার হয়ে ওপারে যাওয়া। নদীতে খেয়া পারাপার করায় এক অসামান্য সুন্দরী নারী। সে মৎসজীবিদের রাজা দাসরাজ কন্যা। নাম কালিন্দী। তীরে ভিড়ল তরী। উঠলেন সাধক। তিনি ব্রহ্মার মানসপুত্র ভগবান মনুর সন্তান বেদজ্ঞ ৠষি পরাশর। চার চোখের মিলনে একে অপরকে ভালোলাগা। কিন্তু কালিন্দীর গায়ে যে মাছের আঁশটে গন্ধ! পরাশরের তপোবলে কালিন্দীর গায়ে পদ্মফুলের গন্ধ বেরুতে থাকল! নতুন নাম হলো পদ্মগন্ধা। যোজন ব্যাপী সেই গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তাই অপর নাম হলো যোজনগন্ধা। চার হাত এক হতে সময় লাগল না। কালিন্দী প্রেমকে সত্য বলে মানায় পরাশর তার নাম দিলেন সত্যবতী।

 

বিবাহের পর নবদম্পতি বাস করা শুরু করলেন একটি দ্বীপে। সেখানে শ্রাবণের এক বৃষ্টিমূখর দিনের শেষে মেঘ কেটে আকাশে উঠল পূর্ণচন্দ্র। সেই শ্রাবণী পূর্ণিমায় সত্যবতীর কোল আলো করে এল এক সুলক্ষণ পুত্র সন্তান। তার গাত্রবর্ণ কালো হওয়ায় নাম হলো কৃষ্ণ। দ্বীপে জন্ম গ্রহণ করার ফলে নাম হলো দ্বৈপায়ণ। পিতার মতো পুত্রও আয়ত্ত করলেন সব বেদ। আয়ত্ত করলেন বেদান্ত, উপনিষদ, পুরাণ। হয়ে উঠলেন সর্বশাস্ত্র বিশারদ। শুরু করলেন ব্রাহ্মণের মূল কর্ম পুজোপাঠের পাশাপাশি অধ্যাপনা। কত তাঁর শিষ্য! অগুন্তি তাঁর ভক্ত। তাঁর উত্তরসূরি সুযোগ্য পুত্র শুকদেবের পাশাপাশি তৈরি করলেন পৈল, সুমন্ত, জৈমিনি ও বৈশম্পায়ণের মতো বেদজ্ঞ ৠষিদের। সংকলিত করে চার বেদের শ্রেণীবিভাগ করলেন। লিখলেন সতপথ ব্রাহ্মণ, ব্রহ্মসূত্র প্রভৃতির মতো সমৃদ্ধ শাস্ত্র গ্রন্থ বিশ্ব চিনল তাঁকে কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাস নামে। এই ব্যাসদেবই সমগ্র জগতে পরিচিত হলেন আদিগুরু নামে। তাই শ্রাবণী পূর্ণিমার দিনটি পালন করা হয় গুরু পূর্ণিমা রূপে।

 

তারপরে কেটে গেল আরও কত দিন। বিশালবুদ্ধি মহামতি ব্যাসদেব আসন পাতলেন বদরিনারায়ণ ক্ষেত্রের আওতায় অলকানন্দার উৎস বসুধারা গুহায়। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিলেন দেবী সরস্বতী। বাগদেবীর আশীর্বাদধন্য হয়ে শুরু করলেন পঞ্চম বেদ মহাভারত লেখার কঠিন কাজ। কর্মে সিদ্ধিলাভের সহায়ক সিদ্ধিদাতা গণেশ। গণেশ এলেন ব্যাসদেবের সমুখে। ব্যাসদেব বলবেন আর তাঁর একটি ভাঙা দাঁত দিয়ে তা শ্রুতিলিখন করবেন একদন্ত মহাকায় গণেশ। শর্ত একটাই। কখনোই থামতে পারবেন না ব্যাসদেব! শর্তে রাজি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিবের বরে চিরঞ্জীবী ব্যাসদেব। শুরু হলো মহাভারত লেখা। বলা ও লেখা চলছে অবিরাম! তবে সামান্য বিশ্রাম প্রয়োজন। লেখার মধ্যে ব্যাসদেব বলতে শুরু করলেন ব্যাসকূট! ফলে কঠিন শ্লোকের ব্যাখ্যা লিখতে খানিক সময় নিলেন গণেশ। এই সুযোগে কিঞ্চিৎ বিশ্রাম নিয়ে নিলেন ব্যাসদেব!

 

শেষ হলো ১৮ পর্বের মহাকাব্য ১ লক্ষ শ্লোক বিশিষ্ট মহাভারত। দেবদেবীরা আশীর্বাদ করলেন বিশালবুদ্ধি মহামতি ব্যাসদেবকে। এমন এক কাব্যগ্রন্থ যা তুলে ধরে দেবভূমি, তপোভূমি ভারতবর্ষকে। তার সামাজিক অবস্থান ও অনুশাসনকে। তাই তো বলা হয়-“যা নেই ভারতে তা নেই ভারতে!” অর্থাৎ যা মহাভারতে নেই তা ভারতবর্ষেও নেই। কাজ শেষ হলো তাঁর। আর মহাভারত? সে যে নিজেকে লিখে চলেছে আজও!

 

 

 

 

 

 

 

সাব এডিটর – অনুরাধা ভট্টাচার্য্য শর্মা, সোমনাথ মুখোপাধ্যায় , প্রতীক চ্যাটার্জী

এডিটর – দিব্যেন্দু দাস

এডিটর ইন চিফ – ড: রাকেশ শর্মা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *