‘ভারত আবার জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’ – কীভাবে?
অমিত গোস্বামী , রাজনৈতিক বিশ্লেষক, রঙ নিউজ
পকেটে পার্স নেই, ক্ষতি নেইঃ
পকেটে পার্স নেই, ক্ষতি নেই, মোবাইল আছে তো? ইউপিআই বা অন লাইন পেমেন্ট এখন সবাই অভ্যস্থ। যত কম টাকা হোক এই পদ্ধতিতে মুহুর্তে টাকা পরিশোধ করেন সবাই। পাবলিক বাসে বা ফুটপাথের চায়ের দোকানের মত কিছু জায়গা বাদ দিলে সবক্ষেত্রেই আমরা ইউপিআই-এর মাধ্যমে এখন লেনদেন করি। তাই তো? এই ইউপিআই পেমেন্ট সিস্টেম ভারতে দশ বছর পূর্ণ করল। ২০১৬ সালের ২৫ অগাস্ট ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI) এবং ইন্ডিয়ান ব্যাংকস অ্যাসোসিয়েশন (IBA)-এর যৌথ উদ্যোগে গঠিত NPCI (National Payments Corporation of India বা ভারতীয় জাতীয় অর্থ প্রদান নিগম) ২১ টি ব্যাঙ্ককে এই উদ্যোগে সামিল করে শুরু হয় ইউপিআই-এর জয়যাত্রা। কিন্তু তার আগে দেখা যাক ইউপিআই কী?
অনলাইন এখন সবখোল চাবিঃ
UPI-এর পুরো কথাটা হচ্ছে Unified Payments Interface (ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস)। এই ব্যবস্থায় লাভ কী? এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ভারতের নিজস্ব রিয়েল-টাইম পেমেন্ট সিস্টেম। রিয়েল-টাইম পেমেন্ট সিস্টেম হচ্ছে এমন একটি ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা, যেখানে এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর সাথে সাথেই (মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে) তা প্রাপকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য হয়। সনাতন ব্যাংক লেনদেনে অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা বা পরের কার্যদিবস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, কিন্তু রিয়েল-টাইম সিস্টেমে কোনো অপেক্ষার প্রয়োজন হয় না। এতে টাকা পাঠানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রাপকের অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স যোগ হয় এবং লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার বার্তা চলে আসে। ব্যাংক বন্ধের দিন, রবিবার বা গভীর রাতেও এই পরিষেবা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকে। সরাসরি ব্যাংক টু ব্যাংক ট্রান্সফার হয়। লেনদেন সফল হলো কি না, তা প্রেরক ও প্রাপক উভয়ই সাথে সাথে নোটিফিকেশন বা এসএমএসের মাধ্যমে জানতে পারেন। এইজন্যে লাগে শুধু একটা Quick Response Code (কুইক রেসপন্স কোড)। কিউআর কোড (QR Code) অর্থাৎ এটি মূলত একটি দ্বি-মাত্রিক (2D) বারকোড, যা যেকোনো অপটিক্যাল স্ক্যানার বা স্মার্টফোনের ক্যামেরার মাধ্যমে চোখের পলকে পড়ে ফেলা (স্ক্যান করা) যায়। এর মাধ্যমে টাকা লেনদেন সম্ভব। কিউআরকোড ছাড়াও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত ও UPI সক্রিয় থাকা মোবাইল নম্বর, ইউপিআই আইডি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং আইএফএসসি কোড ও পেমেন্ট রিকোয়েস্ট বা কালেক্ট মানি মাধ্যমে লেনদেন করা যায়। এরজন্যে প্রয়োজন একটি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ।
নরেন্দ্র মোদির স্বপ্নউড়ানঃ
এবার আসি আসল কথায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বপ্নউড়ান ছিল এই প্রকল্পটি। শুরুর বছরের প্রথম মাসে সারা ভারতে মাত্র ৯০০০০ লেনদেন হয়। তারপরে? সারা ভারতে কী হল?
১) প্রথম মাসে মাত্র ৭ লক্ষ টাকার লেনদেন হয়।
২) প্রথম অর্থবর্ষে লেনদেন হয় ১.৭৮ কোটি টাকা।
৩) ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে লেনদেন হয়েছে ২৪১৬২ কোটি টাকা।
৪) এই মুহুর্তে বিশ্বের এই ধরনের লেনদেনের ৪৯ % শুধু ইউপিআই-এর মাধ্যমে হয়।
৫) শুরুর দিকে ১৮৮% গ্রোথ হলেও এখন এই লেনদেন গ্রোথ ৩০%।
৬) এখন প্রতিদিন ৬৬ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। জুলাই,২০২৬ এ হয়েছে ২৩৬৬ কোটি।
৭) শুরুতে ২১ টি ব্যাঙ্কের গ্রাহকরা এই সুবিধা পেলেও ক্রমে এখন ৭৪১ টি ব্যাঙ্কের গ্রাহকরা এই সুবিধা পান।
ঘুম উড়েছে ভিসা-মাস্টারকার্ডেরঃ
ভারতে এই ইউপিআই ও RuPay সিস্টেম (ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের) চালু করায় (২০১৮ সালে চালু হয়) আন্তর্জাতিক বাজারের মূল অর্থনৈতিক খেলোয়াড় VISA ও MasterCard এর ঘুম উড়ে গেছে। তখন নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘ সবাইকে সীমান্তে গিয়ে যুদ্ধ করতে হবে না, কিন্তু প্রত্যেক ভারতীয়র অর্থনৈতিক যুদ্ধে ভারতকে জেতাতে হবে”। ফলে ভিসা ও মাস্টারকার্ড আমেরিকার সরকারের কাছে অভিযোগ করে যে ভারত সরকার খোলা বাজার অর্থনীতিতে নিজেদের সংস্থাকে সুবিধা দিচ্ছে। ভারত পাত্তা দেয় নি। ভারতে এই ইউপিআই কে আইএমএফ স্বীকৃতি দিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে Google Pay, Phone Pay, PayTM, BHIM -এর মত আন্তর্জাতিক এজেন্সি। UPI এখন ১১ টি দেশে লেনদেনের জন্যে যুক্ত হয়েছে। যেমন সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, সিঙ্গাপুর, ফ্রান্স, গ্রীস, মালদ্বীপ ও আরো কয়েকটি দেশে। আরো ২৪ টি দেশের সাথে চুক্তি হয়েছে যে’দেশগুলি অনতিবলম্বে চালু হয়ে যাবে এই পদ্ধতি।
ব্রিকস মুদ্রার হাত ধরে ভারত কি সিংহাসনে বসবে?
আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে এবার আসছেন ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিং পিং সহ সদস্য রাষ্টপ্রধাণরা। ডলারের বদলে ব্রিকস মুদ্রা চালুর চেষ্টা চলছে বহুদিন ধরে। কনসেপ্টটা এ’রকম যে কোন বাস্তব মুদ্রা থাকবে না, কিন্তু বিনিময় হবে অনলাইন পদ্ধতিতে। ব্রিকস ব্যাঙ্কও তৈরি হয়েছে। এখানে যে বানিজ্য ঘাটতি আছে বিভিন্ন দেশের মধ্যে তা কমানো আশু প্রয়োজন। যেমন ভারত রাশিয়া থেকে খনিজ তেল কেনে ৫৫ বিলিয়ন ডলারের, ভারতীয় পণ্য রপ্তানি হয় ৫ বা ৬ বিলিয়ন ডলার। চিনের সাথেও বানিজ্য ঘাটতি অনেক। কাজেই এই ঘাটতি কমানোর চুক্তি কতটা ফলপ্রসু হয় সেটাও দেখার। সেটা সম্ভব হলে ব্রিকস দেশেও ভারতীয় ইউপিআই চালু হবে। ভারত যেহেতু কোন ব্লকে নয় ও অন্যান্য দেশের কোন অর্থনৈতিক শর্তের কাছে মাথা নোয়ায় নি, কাজেই ভারতীয় মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষেত্রে ক্রমেই উঠে আসছে। ভারতে ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে ১২৮ কোটির কাছে মোবাইল ফোন আছে। ইন্টারনেটও অন্য দেশের তুলনায় সস্তা। কাজেই ভারত যে অতি দ্রুত অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার বাজারে দ্রুত নেতৃত্ব দেওয়ার রাস্তায় হাঁটছে তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।