মা বগলামুখী নীরবতার ভিতরে যে শক্তি

মা বগলামুখী

নীরবতার ভিতরে যে শক্তি

দেবপ্রিয়া বারিক : রঙ নিউজ

 

কখনও কি ভেবেছেন—শক্তি মানেই কি শুধু আঘাত করা?

সবসময় নয়।

কখনও শক্তি মানে এগিয়ে যাওয়া, কখনও প্রতিবাদ করা; আবার কখনও এমন একটি মুহূর্ত আসে, যখন সবকিছুকে থামিয়ে দেওয়াই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শক্তি।

দশমহাবিদ্যার জগতে সেই ‘থামিয়ে দেওয়ার শক্তি’র এক অনন্য প্রতীক হলেন মা বগলামুখী—শাক্ত ঐতিহ্যে যিনি দশমহাবিদ্যার অষ্টম রূপ হিসেবে পরিচিত। তাঁর আরেক নাম পীতাম্বরা—হলুদ বস্ত্রধারিণী।

ঝড় থামাতে এসেছিলেন যিনি

মা বগলামুখীকে ঘিরে প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনিতে বলা হয়, একসময় প্রবল ঝড়ে সৃষ্টিজগৎ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। চারদিকে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা ও ভয়ের পরিবেশ। সেই সময় দেবীর এক বিশেষ শক্তিরূপ আবির্ভূত হয়ে সেই তাণ্ডবকে স্তব্ধ করেন।

কাহিনির এই অংশটিই বগলামুখী-তত্ত্বের মূল ভাবনাটিকে সামনে আনে—

যে শক্তি ধ্বংসের গতি থামাতে পারে, সেটিই কখনও কখনও সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।

তাই তাঁকে ‘স্তম্ভনশক্তি’র সঙ্গে যুক্ত করা হয়—অর্থাৎ ক্ষতিকর বা অশুভ শক্তির গতি রোধ করার প্রতীকী শক্তি।

কেন সর্বত্র হলুদ?

মা বগলামুখীর কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হলুদ রং।

হলুদ বস্ত্র, হলুদ ফুল, হলুদের উপাচার—তাঁর উপাসনায় এই রঙের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সেই কারণেই তাঁর নাম পীতাম্বরা।

কিন্তু এই হলুদ শুধুই একটি রং নয়।

হলুদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আলো, পবিত্রতা, উজ্জ্বলতা, সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের কথা।

অন্ধকারের মধ্যে যেমন একটি প্রদীপের আলো আলাদা করে চোখে পড়ে, তেমনই বগলামুখীর হলুদ রূপ যেন অস্থিরতার মাঝখানে স্থিরতার প্রতীক।

দেবীর হাতে ধরা জিহ্বার অর্থ কী?

মা বগলামুখীর প্রচলিত মূর্তিতে একটি বিশেষ দৃশ্য দেখা যায়—তিনি এক অসুরের জিহ্বা ধরে রেখেছেন এবং অন্য হাতে গদা ধারণ করেছেন।

দৃশ্যটি প্রথম দর্শনে ভয়ংকর মনে হতে পারে।

কিন্তু এর ভিতরে রয়েছে গভীর প্রতীকী অর্থ।

জিহ্বা মানে শুধু কথা নয়—জিহ্বা মানে বাক্য, বক্তব্য এবং তার শক্তি।

একটি কথা কাউকে সারাজীবনের জন্য আপন করে নিতে পারে। আবার একটি ভুল কথা সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারে। মিথ্যা, অপবাদ, কটু বাক্য কিংবা উসকানিও মানুষের জীবনে বড় অশান্তি তৈরি করতে পারে।

তাই দেবীর জিহ্বা ধারণের প্রতীকী ব্যাখ্যা হতে পারে—

“বাক্যের উপর নিয়ন্ত্রণই আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি বড় ধাপ।”

অর্থাৎ দেবীর কাছে প্রার্থনা শুধু অন্যের মুখ বন্ধ করার জন্য নয়; নিজের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা ভুল শব্দকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তির জন্যও হতে পারে।

তাহলে কি মা বগলামুখী শুধু ‘শত্রুনাশের দেবী’?

এখানেই তাঁকে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।

লোকবিশ্বাস ও কিছু তান্ত্রিক ঐতিহ্যে তাঁর উপাসনাকে শত্রু-প্রতিকূলতা ও বাধা নিবারণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু দেবীর প্রতীকী রূপকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখলে তিনি আমাদের শেখান—

অন্যকে থামানোর আগে নিজের ক্রোধকে থামাও।

অন্যের ভুল খোঁজার আগে নিজের অহংকারকে থামাও।

অন্যের বিরুদ্ধে কথা বলার আগে নিজের কথাকে যাচাই করো।

এই দৃষ্টিতে বগলামুখী কেবল বাহ্যিক শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তির প্রতীক নন; তিনি মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের বিরুদ্ধেও এক আধ্যাত্মিক প্রতীক।

ভারতের মাটিতে তাঁর উপাসনা

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মা বগলামুখীর উপাসনার প্রচলন রয়েছে। মধ্যপ্রদেশের আগর মালওয়া জেলার নলখেড়া বিশেষভাবে পরিচিত বগলামুখী মন্দিরের জন্য। লাখুন্দর নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দিরটি স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য ও শাক্ত-শৈব সাধনার সঙ্গে যুক্ত।

মন্দিরকে ঘিরে মহাভারত-যুগ এবং যুধিষ্ঠিরের উপাসনার যে কাহিনি প্রচলিত, তা মূলত ধর্মীয় লোকবিশ্বাস ও স্থানীয় ঐতিহ্যের অংশ—তাই তাকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে না দেখে ঐতিহ্য হিসেবেই দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত।

বগলামুখীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা

জীবনেও তো এমন ঝড় আসে।

কেউ আমাদের অপমান করে।

কেউ ভুল বোঝে।

কেউ অন্যায় কথা বলে।

কখনও পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

সেই মুহূর্তে আমরা অনেক সময় সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে চাই।

কিন্তু বগলামুখীর প্রতীক যেন ধীরে বলে—

“এক মুহূর্ত থামো।”

কারণ সব কথার উত্তর কথা দিয়ে দিতে হয় না।

কিছু উত্তর নীরবতায় দেওয়া যায়।

কিছু যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়াই জয়।

আর কিছু পরিস্থিতিতে নিজের মনকে স্থির রাখতে পারাটাই সবচেয়ে বড় বিজয়।

তাই মা বগলামুখীর হলুদ রূপকে শুধু ভয়ের চোখে নয়, স্থিরতা ও আত্মসংযমের আলোয় দেখলে তাঁর মাহাত্ম্য আরও গভীর হয়ে ওঠে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *