রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের তিন সন্ন্যাসী এবং IIM কলকাতার অধ্যাপককে নিয়ে নতুন কমিশন, শিক্ষামহল আশাবাদী 

WBCSSC-তে নতুন চার সদস্য: মেধা, নৈতিকতা ও স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থার প্রত্যাশা

 

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের তিন সন্ন্যাসী এবং IIM কলকাতার অধ্যাপককে নিয়ে নতুন কমিশন, শিক্ষামহল আশাবাদী

 

দিব্যেন্দু দাস, রঙ নিউজ। ১২ আগস্ট

 

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক নিয়োগ ও স্কুলশিক্ষা প্রশাসনে নতুন প্রত্যাশার সঞ্চার হয়েছে। West Bengal Central School Service Commission (WBCSSC)-এ চারজন নতুন সদস্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘিরে শিক্ষামহলে ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকারের স্কুল শিক্ষা দফতরের সেকেন্ডারি ব্রাঞ্চের ১১ আগস্ট ২০২৬-এর সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, কমিশনে চারজনকে সদস্য হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁরা অবিলম্বে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পদে বহাল থাকবেন।

 

সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী নতুন সদস্যরা হলেন স্বামী আত্মপ্রিয়ানন্দ, স্বামী শাস্ত্রজ্ঞানানন্দ, স্বামী তত্ত্বসারানন্দ এবং অধ্যাপক রম্যা তারাকাড ভেঙ্কটেশ্বরন। তাঁদের মধ্যে প্রথম তিনজন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। অধ্যাপক রম্যা তারাকাড ভেঙ্কটেশ্বরন IIM কলকাতার স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজমেন্ট গ্রুপের অধ্যাপক।

 

নিয়োগের এই বিন্যাসের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ। কারণ, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের দীর্ঘদিনের পরিচিতি চরিত্রগঠন, মানবসেবা, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, IIM-এর মতো দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপকের অন্তর্ভুক্তি কমিশনের কাজে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা-দৃষ্টিভঙ্গি ও গুণগত মানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সম্ভাবনাকে সামনে আনছে।

 

‘মানুষের সেবাই ঈশ্বরের সেবা’—শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যবোধের প্রত্যাশা

 

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের মানবসেবামূলক ঐতিহ্য ভারতীয় সমাজজীবনে দীর্ঘদিনের। স্বামী বিবেকানন্দের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত এই প্রতিষ্ঠান শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজসেবা ও চরিত্রগঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিশনে দায়িত্ব দেওয়া হওয়ায়, তাঁদের কাছ থেকে সততা, নিরপেক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং জনসেবার মানসিকতার প্রতিফলন প্রত্যাশা করছেন অনেকে।

 

শিক্ষক নিয়োগ কেবল কর্মসংস্থানের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মান। একজন শিক্ষকই আগামী দিনের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, চিন্তাশক্তি, চরিত্র ও মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রকৃত যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি নৈতিক দায়িত্ববোধ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ।

 

মেধার ভিত্তিতে নিয়োগই এখন প্রধান প্রত্যাশা

 

নতুন কমিশনের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাগুলির একটি হল—যোগ্য ও প্রকৃত মেধাবী প্রার্থীরা যেন তাঁদের যোগ্যতার ভিত্তিতেই সুযোগ পান। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং নির্ধারিত নিয়মের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের।

 

শিক্ষামহলের প্রত্যাশা, শিক্ষক নিয়োগে প্রার্থীর বিষয়জ্ঞান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, পরীক্ষার ফলাফল এবং নির্ধারিত মেধাক্রম যথাযথ গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে এমনভাবে পরিচালনা করা হবে যাতে কোনও ধরনের অনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাত বা দুর্নীতির অভিযোগের সুযোগ না থাকে।

 

অবশ্য নতুন সদস্যদের নিয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি করার সময় এখনও আসেনি। বরং তাঁদের কার্যকরী দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হবে এই প্রত্যাশাগুলি বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়।

 

যোগ্য শিক্ষক, উন্নত শিক্ষা—নতুন অধ্যায়ের প্রত্যাশা

 

শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে প্রথম শর্তগুলির একটি হল যোগ্য শিক্ষক নির্বাচন। তাই শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থায় যদি মেধা, স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এবং গুণগত মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া যায়, তার ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে স্কুলশিক্ষার উপর পড়তে পারে।

 

নতুন চার সদস্যের মধ্যে একদিকে রয়েছে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের আধ্যাত্মিক ও মানবিক মূল্যবোধের ঐতিহ্য, অন্যদিকে রয়েছে উচ্চশিক্ষা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা। এই দুই ধারার সমন্বয় WBCSSC-র কাজের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে বলেই প্রত্যাশা।

 

এখন নজর থাকবে কমিশনের আগামী দিনের সিদ্ধান্ত ও কার্যপ্রণালীর দিকে। নিয়োগে মেধার মর্যাদা, প্রশাসনে স্বচ্ছতা, সিদ্ধান্তে নিরপেক্ষতা এবং শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত মান—এই চারটি স্তম্ভকে সামনে রেখে WBCSSC এগোতে পারলে শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থায় একটি নতুন আস্থার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

 

নতুন সদস্যদের নিয়োগ তাই শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; শিক্ষামহলের কাছে এটি একটি সম্ভাবনার সূচনা। সেই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা সাফল্যে রূপ নেয়, তার উত্তর দেবে আগামী দিনের কাজ।

 

প্রত্যাশা একটাই—যোগ্যতা হোক নিয়োগের প্রধান পরিচয়, নৈতিকতা হোক প্রশাসনের ভিত্তি এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন হোক প্রতিটি সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *