জাগ্রত তীর্থ তারকেশ্বর
✍️সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম। তাঁর জন্ম নেই। তিনি জন্ম মৃত্যু রহিত স্বয়ম্ভু। তিনিই শিব। শিব সুন্দর। শিবই সত্য। সত্যাশ্রয়েই অবস্থান করেন দেবাদিদেব মহাদেব। তাই শিব মানেই সুন্দর। শিব মানেই পরম শান্তি। তাইতো যুগে যুগে, কালে কালে পুজিত হয়ে আসছেন মঙ্গলের প্রতীক শিব। চন্দ্রচূড়, ঈশান, বিভূতিভূষণ, ভূজঙ্গভূষণ, বিরূপাক্ষ কত তাঁর নাম। তিনিই আবার বৈদ্যরাজ। রোগ নিরাময়ের জন্য তাঁর চরণেই হত্যে দিয়ে পড়ে মানুষ। আজ তেমনই এক অতি জনপ্রিয় শৈবতীর্থ মাহাত্ম্যের অবতারণা যাঁর কাছে রোগজ্বালা থেকে মুক্তি পেতে দলে দলে ছুটে যায় মানুষ। একবিংশ শতাব্দীতেও বাঁক কাঁধে নিয়ে শ্রাবণ মাসে দীর্ঘ পথ হেঁটে তাঁর মাথায় জল ঢালতে যায় লাখো ভক্ত। তিনি পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার প্রসিদ্ধ বাবা তারকেশ্বর তারকনাথ।
এই শৈবতীর্থের মাহাত্ম্যের ইতিহাস জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে বেশ কিছু বছর আগে। উল্টে পাল্টে দেখতে হবে জনশ্রুতি, কিংবদন্তির অজানা কিছু অধ্যায়। পরম ধার্মিক এক শিবভক্ত বিষ্ণুদাস রাও নামে উত্তরপ্রদেশের এক রাজা তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার হুগলিতে আসেন। পরিবার পরিজন, লোকলস্কর, পাইক বরকন্দাজ, দাসদাসী সহ বাস করতে থাকেন প্রাসাদোপম অট্টালিকায়। দেবদ্বিজে ভক্তি, পূজার্চনা, দানধ্যান করা রাজাকে সকলেই শ্রদ্ধা করত। জানা যায়, রাজার ছিল কপিলা নামে একটি সুলক্ষণা দুগ্ধবতী গাভী। প্রতিদিনই সে বিস্তর দুধ দিত। রাজার ভাই ভারমল রাওয়ের ওপর ভার ছিল প্রতিদিন গাভীটিকে মাঠে চরিয়ে আনা। ভারমল লক্ষ্য করেন প্রতিদিনই খানিকক্ষণের জন্য কপিলা তাঁর চোখের আড়ালে চলে যায়। পরে আবার ফিরেও আসে। বিষয়টি ততটা গুরুত্ব না দিলেও দিন দিন পরিমাণে কমে যেতে থাকল কপিলার দুধ। চিন্তায় পড়েন রাজা বিষ্ণুদাস। সন্ধান করে দেখা যায় যে প্রতিদিন জঙ্গলর একটি নির্দিষ্ট স্থানে সামান্য জেগে থাকা এক পাথরের উপর দুধ ঢেলে দেয় কপিলা। আশ্চর্য হয়ে জায়গাটির মাটি খোঁড়ার নির্দেশ দেন রাজা। বেরিয়ে আসে একটি শিবলিঙ্গ! আরও জানা যায়, সেদিন রাতে স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেবের স্বপ্ন পান রাজা। জানতে পারেন এই শিবের নাম তারকনাথ আর এই স্থানের নাম তারকেশ্বর। শিবের নির্দেশ অনুযায়ী মন্দির তৈরি করে তাঁর প্রধান পুরোহিত হন রাজা বিষ্ণুদাস। ক্রমে লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে জাগ্রত তীর্থ তারকেশ্বরের কথা।
এরপর কেটে গিয়েছে কত বছর। হুগলির শেওড়াফুলি নিমাই তীর্থ ঘাট থেকে বাঁকে গঙ্গাজল নিয়ে বাবা তারকনাথের মাথায় জল ঢালতে দূরদূরান্ত থেকে তারকেশ্বরের পথে হেঁটে চলে সংসার তাপে দগ্ধ অসংখ্য নারী পুরুষ ভক্ত। মুখে তাদের “বোম্ বোম্ তারকবোম্, ভোলেবোম্ তারকবোম্। ভোলেবাবা পার করেগা, ত্রিশূলধারী পার করেগা” ধ্বনি। কেউ এসেছে রোগজ্বালা থেকে মুক্তি পেতে। কেউ বা সংসার জীবনে শান্তি পেতে। কেউ আবার মন্দির সংলগ্ন দুধপুকুরের জলে স্নান করে মন্দির চত্বরে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকে ওষুধের আশায়। তারকনাথ যে স্বয়ং বৈদ্যরাজ!
শোনা যায়, তারকনাথের নাম করতে করতে বাঁক কাঁধে তারকেশ্বরের পথে হেঁটে যেতে যেতে পথশ্রমে শ্রান্ত, ক্লান্ত হয়ে পথের ধারে পড়ে যান এক বৃদ্ধা। কেউ ফিরে না তাকালেও ভক্তের আকুল প্রার্থনা শুনলেন ভক্তবৎসল শিব। ছদ্মবেশে নিজে এসে তাঁর ভক্ত ওই বৃদ্ধাকে কাঁধে তুলে পৌঁছে দিয়েছিলেন তারকনাথ মন্দিরে! পৌরাণিক উপাখ্যান অনুযায়ী জানা যায়, শ্রাবণ মাস বাবা মহাদেবের মাস। এই মাসে শিবের মাথায় জল ঢাললে প্রভূত পূণ্য অর্জন করা যায়। ফলে গোটা
শ্রাবণ মাস ধরেই লাখে লাখে ভক্ত ছুটে চলে জাগ্রত তীর্থ তারকেশ্বরের পথে। আকাশে বাতাসে একটাই ধ্বনি-“ভোলেবাবা পার লাগাও, ত্রিশূলধারী শক্তি জাগাও!”
সাব এডিটর – অনুরাধা ভট্টাচার্য্য শর্মা, রামানন্দ দাস, প্রতীক চ্যাটার্জী
ম্যানেজার – বুবুন মাইতি
এডিটর – দিব্যেন্দু দাস
এডিটর ইন চিফ – রাকেশ শর্মা
