যেখানে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে প্রার্থনায় জেগেছিল—নলখেড়ার মা বগলামুখীর অলৌকিক আবহ
দেবপ্রিয়া বারিক : রঙ নিউজ
কুরুক্ষেত্র তখনও শুরু হয়নি।
শঙ্খ বাজেনি।
রথের চাকা ঘোরেনি।
কিন্তু যুদ্ধের ফল নিয়ে উদ্বেগ শুরু হয়ে গিয়েছিল।
মহাভারতের সেই উত্তাল সময়কে ঘিরে নলখেড়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস—যুদ্ধের আগে শুধু অস্ত্রের প্রস্তুতি নয়, দেবীশক্তির আশ্রয়ও চেয়েছিলেন পাণ্ডবরা।

মধ্যপ্রদেশের আগর-মালওয়া জেলার নলখেড়ায়, লখুন্দর নদীর তীরে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই বিশ্বাসের কেন্দ্র—মা বগলামুখীর মন্দির।

এখানে দেবী কেবল একটি মূর্তি নন; ভক্তির ভাষায় তিনি এমন এক শক্তির প্রতীক, যিনি অশান্তির গতি থামিয়ে দিতে পারেন, বিপদের মুহূর্তে মনকে স্থির করতে পারেন এবং অন্যায়ের সামনে মানুষকে দৃঢ় থাকার শক্তি দিতে পারেন।

মধ্যপ্রদেশ সরকারের জেলা প্রশাসনের সরকারি বিবরণেও নলখেড়ার মন্দিরকে লখুন্দর নদীর তীরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সরকারি বিবরণে মহাভারতের বিজয়ের উদ্দেশ্যে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে মহারাজ যুধিষ্ঠিরের দেবী প্রতিষ্ঠার ঐতিহ্যের কথা বলা হয়েছে।

মহাভারতের সঙ্গে নলখেড়ার সেই যোগসূত্র
মহাভারত শুধু একটি যুদ্ধের গল্প নয়—এটি সিদ্ধান্ত, দ্বন্দ্ব, ধর্ম এবং মানুষের অন্তর্গত শক্তির কাহিনি।
নলখেড়ার ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধের আগে শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে যুধিষ্ঠির মা বগলামুখীর আরাধনা করেছিলেন।
এই বিশ্বাসের মধ্যে একটি গভীর বার্তা রয়েছে।
যুদ্ধ জেতার আগে নিজের ভয়কে জয় করতে হয়।
শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার আগে নিজের মনকে স্থির করতে হয়।
আর অস্ত্র হাতে নেওয়ার আগে জানতে হয়—কোন যুদ্ধ সত্যিই ন্যায়ের জন্য।
সেই কারণেই নলখেড়ার বগলামুখী উপাসনাকে শুধু ‘বিজয়ের পূজা’ হিসেবে দেখলে হয়তো তার গভীরতাটা ধরা পড়ে না।
এটি অনেকের কাছে স্থিরতার সাধনা।
তবে মহাভারত-সংক্রান্ত এই বিবরণটি ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের অংশ; এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবে দাবি করা ঠিক হবে না। সরকারি জেলা প্রশাসনের পৃষ্ঠাতেও এটি ঐতিহ্যগত বিশ্বাস হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে।
নলখেড়ার এই মন্দিরের একটি আকর্ষণ হল এর ধর্মীয় পরিবেশ।
মা বগলামুখীর পাশাপাশি এখানে লক্ষ্মী, সরস্বতী, শ্রীকৃষ্ণ, হনুমান ও ভৈরবের উপাসনাও রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শৈব ও শাক্ত সাধকরাও এখানে তান্ত্রিক সাধনার উদ্দেশ্যে আসেন।
অর্থাৎ একই প্রাঙ্গণে যেন—
শক্তি, জ্ঞান, সমৃদ্ধি, ভক্তি ও রক্ষাশক্তি
একটি বৃহৎ আধ্যাত্মিক পরিসর তৈরি করেছে।
এছাড়াও এই মন্দিরের অন্যতম আকর্ষণ ১৭ই আগস্ট নাগ পঞ্চমী দিনের হোম।
হোমের আগুনে যখন একের পর এক আহুতি পড়ে, তখন তার দৃশ্যের মধ্যে ভক্তরা শুধু আগুন দেখেন না—দেখেন নিজের প্রার্থনাকে দেবীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রতীকী পথকে।
হোমের আগুনে কী দেবেন ?
শুধু ঘি, তিল, সর্ষে বা হোমদ্রব্যই নয়—
জ্বলুক অহংকার।
জ্বলুক ভয়।
জ্বলুক অস্থিরতা।
জ্বলুক প্রতিহিংসা।
জ্বলুক নিজের ভুলের প্রতি অন্ধতা।
আর আগুনের পরে থেকে যাক—
বিশ্বাস।
সংযম।
সাহস।
স্বচ্ছতা।
এবং নিজের কর্তব্যের প্রতি অটল থাকার শক্তি।
এই অর্থে হোম কেবল একটি আচার নয়; ভক্তের কাছে এটি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার একটি আধ্যাত্মিক পথ।
মহাভারতের যুদ্ধ থেকে আজকের মানুষের জীবন
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে বহু যুগ আগে।
কিন্তু মানুষের কুরুক্ষেত্র শেষ হয়নি।
আজকের যুদ্ধ হয়—
চিন্তার সঙ্গে,
ভয়ের সঙ্গে,
অর্থকষ্টের সঙ্গে,
সম্পর্কের টানাপোড়েনের সঙ্গে,
অন্যায়ের সঙ্গে,
নিজের দুর্বলতার সঙ্গে।
তাই মহাভারতের সেই প্রাচীন বিশ্বাস আজও নতুন অর্থ পেতে পারে।
যুদ্ধের আগে যুধিষ্ঠির দেবীর আশ্রয় নিয়েছিলেন—এই কাহিনি আজকের মানুষকে মনে করিয়ে দিতে পারে, বড় সিদ্ধান্তের আগে মনকে স্থির করাও এক ধরনের সাধনা।
নলখেড়ার দিকে তাকালে শেষ পর্যন্ত একটি কথাই মনে হয়
লখুন্দর নদী বয়ে যায়।
মন্দিরের ঘণ্টা বাজে।
হোমকুণ্ডে আগুন জ্বলে।
মন্ত্রের ধ্বনি বাতাসে মিশে যায়।
আর একজন মানুষ চোখ বন্ধ করে হয়তো শুধু একটি কথাই বলেন—
“মা, আমার জীবনের যে অশুভ শক্তিকে থামানো দরকার, সেটাই থামাও।
আর যে পথে আমাকে এগিয়ে যেতে হবে, সেই পথে স্থির থাকার শক্তি দাও।”
সম্ভবত এখানেই নলখেড়ার বগলামুখী তীর্থের সবচেয়ে সুন্দর অর্থ—
বিজয় মানে সবসময় অন্য কাউকে হারানো নয়।
কখনও কখনও বিজয় মানে নিজের ভিতরের ভয়কে থামিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
আর সেই সংকল্পের সামনে, হোমের আগুন যেন এক নীরব সাক্ষী।
জয় মা পীতাম্বরা।
