গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ তুলে মমতাকে নিশানা শুভেন্দুর
রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়
কালচারাল কো-অর্ডিনেটআর
রঙ নিউজ
দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে রাজ্যে পালিত হল ‘বিভাজন বিভীষিকা স্মরণ’ দিবস। সেই অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই স্বাধীনতা, দেশভাগ এবং ১৯৪৬-এর ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর প্রসঙ্গ তুলে তৃণমূল সরকার ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। অতীতের ইতিহাস ভুলে গেলে ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত হয় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে কলকাতার সাম্প্রদায়িক হিংসার ইতিহাস এবং দেশভাগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা স্মরণেরও দাবি জানান তিনি।
শুভেন্দুর বক্তব্য, ‘‘আমরা কেউ দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ভুলতে পারি না। দেশভাগ আমাদের জন্য সুখকর নয়। পরিকল্পনা করে দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং হয়েছিল।’’ তাঁর দাবি, সম্প্রতি কলকাতার একটি রাস্তার নাম সুরাবর্দির পরিবর্তে গোপাল মুখোপাধ্যায়ের নামে করা হয়েছে। ‘বিভাজন বিভীষিকা স্মরণ’ দিবসের তাৎপর্যের সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গও জুড়ে দেন তিনি।
এর পরেই সরাসরি রাজ্যের শাসকদলকে নিশানা করেন শুভেন্দু। তাঁর কথায়, ‘‘রাস্তা, উন্নয়ন, শিল্প—সব তো হবে। চাহিদা বাড়বে, দিতেও হবে। তবে বাংলাদেশ হয়ে যাওয়া থেকে আমরা বেঁচে গেছি।’’ তাঁর অভিযোগ, দেশভাগের ইতিহাস এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা দীর্ঘদিন আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে। সেই প্রসঙ্গেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাম তুলে তিনি বলেন, তাঁকে ‘‘ভুলিয়ে রাখা হয়েছিল’’।
বাম আমল নিয়েও কটাক্ষ করেন বিরোধী দলনেতা। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসন এবং পরবর্তী তৃণমূল জমানায় জাতীয়তাবাদের চেতনা যথাযথ ভাবে তুলে ধরা হয়নি। একই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক স্লোগান ও অতীতের নির্বাচনী লড়াইয়ের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর দাবি, ‘খেলা হবে’ বলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেরাই রাজনৈতিক ভাবে মাঠের বাইরে চলে গিয়েছেন। ১৬ অগস্টকে ‘খেলা হবে’ দিবস ঘোষণা নিয়েও মমতাকে আক্রমণ করেন তিনি।
শুভেন্দুর বক্তব্যে বার বার ফিরে আসে ১৯৪৬-এর কলকাতা। স্বাধীনতার ঠিক আগের সেই সময়টিতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগের মধ্যে স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনাকে ঘিরে সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মুসলিম লীগ ‘Direct Action’-এর ডাক দেয়। ১৬ অগস্ট ১৯৪৬ কলকাতায় হরতাল, সভা ও মিছিলকে কেন্দ্র করে দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
তৎকালীন বাংলায় মুসলিম লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল এবং মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন হুসেন শহীদ সুরাবর্দী। রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে শুরু হওয়া উত্তেজনা অল্প সময়ের মধ্যেই মিছিল-পাল্টা মিছিল, সংঘর্ষ, লুঠপাট ও অগ্নিসংযোগে রূপ নেয়। পরে তা ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হিংসায় পরিণত হয়। ১৬ থেকে ১৯ অগস্টের সেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বিপুল প্রাণহানি ঘটে।
১৮ নভেম্বর ১৯৪৬ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দেওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই চার দিনে কলকাতায় প্রায় ৪,০০০ মানুষ নিহত এবং ১০,০০০ জন আহত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে নেহরু আর্কাইভে সংরক্ষিত ১৯৪৬ সালের নথিতে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৫,০০০ এবং আহতের সংখ্যা প্রায় ১৫,০০০ বলে উল্লেখ করা হয়। ১৯৪৭-এর দেশভাগের আগে উপমহাদেশে যে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবেই ইতিহাসে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-কে দেখা হয়।
সেই ইতিহাসকেই সামনে রেখে স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে শুভেন্দুর বার্তা—অতীতকে ভুলে গেলে ভবিষ্যৎও নিরাপদ থাকে না। ইতিহাসের স্মরণকে কেন্দ্র করেই তাঁর রাজনৈতিক আক্রমণের নিশানায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল সরকার।
