“এক দেহে রামকৃষ্ণ”
(যুগাবতার ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ১৪০তম তিরোধান দিবসে বিশেষ প্রতিবেদন)
✍🏾সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
সময়টা ১৮৮৬ সাল। উত্তর কলকাতার কাশীপুর বাগানবাড়ি। আর যে তাঁর কষ্ট চোখে দেখা যায় না। যিনি কথা বলতে কত ভালোবাসতেন, হাসিঠাট্টা মজা করতেন, আর আজ তাঁর কথা বলাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে! গলায় দুরারোগ্য কর্কট রোগের যন্ত্রণায় শরীর কুঁকড়ে উঠছে। ডাক্তাররা সব জবাব দিয়ে চলে গিয়েছেন। শুধু ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের হোমিওপ্যাথি ওষুধ চলছে। খেতে পারছেন না। সারদাদেবী অল্প গরম সুজির পায়েস চামচে করে মুখে ঢেলে দিতে চেষ্টা করছেন। যৎসামান্য কিছু ভিতরে যাচ্ছে। বেশিরভাগই বাইরে পড়ে যাচ্ছে।
উপস্থিত শিষ্য, ভক্তদের মন খারাপ। পায়ের কাছে বসে আছেন প্রিয় শিষ্য নরেন। সকলকে ঘর থেকে বাইরে যেতে বলেন তিনি। তারপর সরাসরি নরেনের দিকে থেমে থেমে প্রশ্ন- ‘হ্যাঁ রে তুই তো কিছু নিলি নে!’ ‘কী নেব? আমার কিছু পাওয়ার নেই।’ ‘কেন অষ্টসিদ্ধি?’ ‘দূর ওসবে কী হবে! চাই না।’ ‘তবে তুই কী চাস?’ ‘আমি চাই একাদিক্রমে ধ্যানস্থ হয়ে নির্বিকল্প সমাধিতে ডুবে যেতে!’ ‘সেকি রে! ছি ছি! তুই তো ভারি হীন! এতদিন ধরে তবে এই শেখালুম! নির্বিকল্প সমাধি মানে নিজের মুক্তি। আর এই যে পোকামাকড়ের মতো কিলবিল করছে এত লোক, তাদের কী হবে রে! তাদের মুক্তির কথা ভাববি নে? পারলে একটা বটগাছ হ। যার ছায়ায় লোকে আশ্রয় পাবে। যেদিন বটগাছ থাকবে না সেদিনও লোকে বলবে যে এখানে একটা বটগাছ ছিল।’ নরেন নির্বাক। অন্তর্ভেদি দৃষ্টি অন্তর্যামী পুরুষের। ‘আচ্ছা আয় আরও কাছে এগিয়ে আয়।’ হঠাৎ তিনি সটান পা তুলে দিলেন নরেনের বুকে! মুহূর্তে সব ওলটপালট হয়ে গেল। সব মুছে গেল। মূলাধার থেকে ভেদ করে যাচ্ছে একের পর এক চক্র। আজ্ঞা থেকে সহস্রদল। স্নিগ্ধ জ্যোতির বলয়ে ভেসে যাচ্ছেন নরেন। ভেঙে গেল ধ্যান! সামনে শোয়া মানুষটির চোখে জল। ‘আজ আমার যথাসর্বস্ব তোকে দিয়ে ফকির হয়ে গেলাম! নিজের বলতে আর কিছুই রাখলাম না। এই দিয়ে জগতে তুই কল্যাণ করবি।’
বাইরে বাগানে কে যেন রাম রাম বলতে বলতে ছুটে চলেছে! ও তো নরেন। ‘ওরে ওকে ডাক। পাগলামি করতে বারণ কর। বল আমি ডাকছি।’ বহু কষ্টে বললেন তিনি। ঘামে ভেজা শরীরে তাঁর সামনে এলেন নরেন। বড়ো বড়ো চোখ করে বললেন- ‘আপনার কষ্ট দেখতে পারছি না আর। কী হলো এতদিন ধরে মা কালীর পুজো করে? মাকে বলতে পারছেন না যে মা আমার কষ্ট কমিয়ে দাও! আমাকে সুস্থ করে তোলো!’ ‘ওরে পাগল, দেখছিস কথা বলতে পারছি না। তবু বকাবি! ওরে শরীর ধারণ করলে কষ্ট যে পেতেই হয়! ত্রেতায় স্বয়ং রামচন্দ্রকে কষ্ট পেতে হয়েছে। দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণকে কষ্ট পেতে হয়েছে। এখন একেও পেতে হচ্ছে!’ নিজের দিকে আঙুল দেখালেন তিনি। ‘তাহলে আপনি আসলে কে? আপনি কি সেই যিনি হরধনু ভঙ্গ করেছিলেন? লঙ্কায় রাবণকে বধ করেছিলেন? গিরিগোবর্ধনকে এক আঙুলে তুলে, সুদর্শন চক্র ধারণ করে কুরুক্ষেত্রের ধর্ম যুদ্ধ করেছিলেন? শিগগির বলুন আসলে কে আপনি?’ ‘ওরে হ্যাঁ রে হ্যাঁ। যিনি রাম তিনিই কৃষ্ণ। কলিতে তিনি এক দেহে রামকৃষ্ণ!’
