‘নৈতিকতার’ নামে জামুইয়ে দুই পড়ুয়াকে হেনস্থা!

‘নৈতিকতার’ নামে জামুইয়ে দুই পড়ুয়াকে হেনস্থা!

স্বতঃপ্রণোদিত পুলিশ অভিযানে এনকাউন্টার, গুলিবিদ্ধ অন্যতম অভিযুক্ত

সাংবাদিক – দিব্যেন্দু দাস, এডিটর, রঙ নিউজ

জামুই, বিহার: সন্ধ্যার পর একসঙ্গে বাড়ি ফেরার ‘অপরাধে’ দুই নাবালক-নাবালিকাকে ঘিরে হেনস্থা ও মারধরের অভিযোগে উত্তাল বিহারের জামুই। দশম শ্রেণির ওই দুই পড়ুয়ার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তদন্তে গতি বাড়ায় পুলিশ। মঙ্গলবার পুলিশের অভিযানে মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত নন্দন যাদব পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে গ্রেফতার হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়। পুলিশ ও প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোচিং থেকে ফেরার পথে ওই কিশোর-কিশোরী জামুইয়ের একটি এলাকায় গিয়েছিল। সেখানে একদল যুবক তাদের পথ আটকায়। এরপর দুজনকে ঘিরে ধরে নানা প্রশ্ন করা হয় এবং তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলিতে কিশোরকে ধরে রাখা ও মারধর এবং কিশোরীর সঙ্গে অশালীন আচরণের দৃশ্য দেখা যায় বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার আরও উদ্বেগজনক দিক হল, পুরো ঘটনাটি ক্যামেরাবন্দি করা হয়। পরে সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পরই বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। প্রাথমিকভাবে ভুক্তভোগীরা সরাসরি পুলিশের কাছে অভিযোগ না করলেও পুলিশ ভিডিও ও অন্যান্য সূত্রের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে। দুই পড়ুয়ার বক্তব্যও নেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশের তদন্তে এখনও পর্যন্ত সাতজনকে ঘটনায় জড়িত বলে শনাক্ত করার কথা জানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে মঙ্গলবারের রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে অভিযান চলছে। ঘটনার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল বা SIT গঠন করা হয়েছে। মামলায় নাবালিকার অভিযোগের প্রেক্ষিতে POCSO আইনের ধারাও প্রয়োগ করা হয়েছে।

এর মধ্যেই মঙ্গলবার ঘটে পুলিশের বড় পদক্ষেপ। তদন্তের অংশ হিসেবে অভিযুক্ত নন্দন যাদবকে ঘটনাস্থলের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় সে পালানোর চেষ্টা করে বলে পুলিশের বক্তব্য। এরপর গুলির ঘটনা ঘটে এবং তার পায়ে গুলি লাগে। পরে তাকে গ্রেফতার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। একই অভিযানে আরও এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। তবে পুলিশের অভিযানের সম্পূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত এখনও চলছে।

ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘মোরাল পুলিশিং’ বা তথাকথিত সামাজিক নৈতিকতার নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। কোনও কিশোর-কিশোরী একসঙ্গে কোথাও যাওয়া বা সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরার বিষয়টি নিয়ে কারও আপত্তি থাকলেও সেই অজুহাতে তাদের আটকে রাখা, মারধর বা শারীরিকভাবে হেনস্থা করার বৈধ অধিকার কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। এই মামলায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়াতেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।

এদিকে ভাইরাল ভিডিও ছড়িয়ে পড়া নিয়েও নতুন করে আইনি পদক্ষেপ করেছে পুলিশ। নাবালিকা ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করে ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগে প্রায় ১২০টি সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। পুলিশের বক্তব্য, নাবালিকার পরিচয় প্রকাশ করে এমন ভিডিও প্রচার করাও গুরুতর অপরাধ।

জামুইয়ের এই ঘটনা তাই শুধু একটি অপরাধের তদন্তে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সামনে এসেছে নাবালকদের নিরাপত্তা, সামাজিক নিয়মের নামে ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং ভুক্তভোগীর পরিচয় সুরক্ষার মতো একাধিক প্রশ্ন। তদন্ত এগিয়ে চলেছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—ঘটনার ভিডিও আর ছড়িয়ে না দিয়ে নাবালক-নাবালিকার পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করা এবং আইনি প্রক্রিয়াকেই তদন্ত ও বিচারের ভিত্তি হিসেবে রাখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *