পুজোয় আরতি ও তার ফল
✍🏾সোমনাথ মুখোপাধ্যায়:Rong News
দেবদেবীর পুজার্চনার অন্যতম প্রধান অঙ্গ হলো আরাত্রিকা বা আরতি। পুজোর শেষে বিভিন্ন উপচারের মাধ্যমে পুজ্য দেবদেবীর আরতি করে থাকে পুজক। বলা যায় যে আরতি ছাড়া পুজো সম্পন্ন হয় না। যে মানুষ আর কিছু না পারলেও অন্ততঃ ধূপকাঠি দিয়েও তার আরাধ্য দেবদেবীকে আরতি করে থাকে। এতে পুজিত দেবদেবী সন্তুষ্ট হন। সঠিক মন্ত্রচ্চারণ না করলে বা সব মন্ত্র জানা না থাকলে কিংবা যথাযথ পুজোর মুদ্রা দেখানো না হলেও শুধুমাত্র আরতির দ্বারা তুষ্ট হন পুজিত দেবদেবীরা। পুজোর ভুলত্রুটি মুছে যায় ভক্তিভরে আরতি করলে। ফলে যে কোনও পুজোয় আরতি যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে থাকে।

গৃহস্থ ঘরে না হলেও সাধারণত কোনোও দেবস্থানে মঙ্গলারতি, পুজারতি, ভোগারতি, সন্ধ্যারতি ও শয়নারতি দিনে এই পাঁচবার আরতি করা হয়ে থাকে।পঞ্চপ্রদীপ, কর্পূর, ধূপ, দর্পণ, জলপূর্ণ পাণিশঙ্খ, ফুল, বস্ত্র, ধেনুপুচ্ছ বা চামর, পাখা প্রভৃতির মাধ্যমে আরতি করা হয়ে থাকে। সঙ্গে বাজে ঘন্টা। ঘন্টা সর্ববাদ্যময়ী তাই ঘন্টা বাজলে কাঁসর, ঘড়ি না বাজালেও চলে। এবার আরতির উপচারের প্রতি চোখ রাখা যাক। আরতির প্রতিটি উপচার অত্যন্ত তাৎপর্য বহন করে। যেমন পঞ্চপ্রদীপ বা কর্পূর অগ্নি বা তেজের প্রতীক, জলপূর্ণ পাণিশঙ্খ জলের প্রতীক, বস্ত্র বাতাসের প্রতীক, ফুল মাটির প্রতীক এবং চামর আকাশের প্রতীক যা কিনা সব মিলিয়ে ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম বা পঞ্চভূতের প্রতীক। এবার আরও একটু গভীরে যাওয়া যাক। পঞ্চপ্রদীপের পঞ্চ অগ্নিশিখা জীবের পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে ইঙ্গিত করে। অগ্নিশিখা একাগ্র মনের প্রতীক। ফলে একাগ্র মনে পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে আরাধ্য দেবদেবীর চরণে নিবেদন করা বস্তুত পঞ্চপ্রদীপের আরতি। মনের কামনা, বাসনা, লোভ, ক্রোধ দেবতার চরণে উৎসর্গ করার প্রতীক কর্পূর আরতি। ধূপের আরতি আদতে অগ্নিশুদ্ধি। ধূপ যেমন নিজে শেষ হয়ে সুগন্ধ বিতরণ করে তেমনই নিজেকে অগ্নিশুদ্ধি করে অবিদ্যা, অজ্ঞান বিনাশ করে শুদ্ধসত্ত্ব মনে দেব চরণে উৎসর্গীকৃত হওয়া। দর্পণ হলো আত্মা স্বরূপ। জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার একীভূত হওয়ার প্রতীক দর্পণে আরতি। শুদ্ধতার প্রতীক শঙ্খের দ্বারা দেবদেবীর চরণ ধুয়ে দেওয়াই শঙ্খ আরতি। বস্ত্র দ্বারা আরতি আপাতদৃষ্টিতে দেবতার অঙ্গ মুছিয়ে দেওয়ার বিষয় হলেও মন মন্দিরে দেবতার স্থায়ী আসন পাততে গেলে অন্তরাত্মার শুদ্ধিকরণ প্রয়োজন। বস্ত্র আরতি তারই প্রতীকী রূপ। আত্মপুস্পটি দেবতার চরণে অর্ঘ দেওয়াই ফুল দ্বারা আরতি। চামর ব্যাজন বা পাখার দ্বারা আরতি আরাধ্য দেবদেবীর তুষ্টীকরণ ও তাঁকে সুশীতল করা।

আরতি করার কোনোও ভেদাভেদ নেই। নারী, পুরুষ, দীক্ষিত, অদীক্ষিত সকলেরই আরতি করার অধিকার আছে। আরতিতে মন শান্ত ও পবিত্র হয়। একাগ্রতা বাড়ে। উত্তেজনা কমে মন স্থির হয়। ভয়ভীতি, অবসাদ দূর হয়। ঘরে শান্তির বাতাবরণ তৈরি হয়। আরতিতে ভগবদ্ভক্তির পাশাপাশি আত্মনিবেদন, শরণাগতি লাভ হয় আরাধ্য দেবদেবীর পাদপদ্মে। তিনি যে ভক্তের ভাবটুকু গ্রহণ করেন! তাই তো তিনি ভাবগ্রাহী জনার্দন!

