যাদবপুরে তান্ডব বামজোটের অস্তিত্বরক্ষার মতলবী চাল
অমিত গোস্বামী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, রঙ নিউজ
ফুটেজ খাওয়া পণ্ডিতপ্রবরঃ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে লক্ষ্য করলাম কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, কবি তাদের চিরাচরিত স্টাইলে হিন্দুত্ববাদকে ও নতুন গঠিত সরকারকে আক্রমন করে বক্তব্য রাখছেন। বিষয়টা না বুঝে এই বক্তব্য বিতরণ তাদের প্রচার টানার কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় যে ছাত্রদের কাছে একটা সবপেয়েছির অঞ্চল তা আজ সকলের জ্ঞাত বিষয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যথেচ্চারের কারন উন্মোচণ করতে হলে এখানকার রাজনীতি আপনাকে আগে বুঝতে হবে। ফিরে যেতে হবে অতীতে।
যাদবপুরের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসঃ
১) যাদবপুর বাম রাজনীতির আঁতুরঘর বলে পরিচিত। এসএফআইয়ের দাপট আছে ঠিকই, কিন্তু DSF, FAS, WTI-র পোস্টার আর স্লোগানে মুখ ঢাকা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন করতেই পারেন এরা কারা? বামফ্রন্ট তখন সবে ক্ষমতায় এসেছে। ওই বছর যাদবপুরে তৈরি হয় ডেমোক্র্যাটিক স্টুডেন্টস ফেডারেশন বা DSF। সংগঠনটি নকশালপন্থী ভাবধারায় বিশ্বাসী হলেও নিজেদের শুধু বিপ্লবী বাম (REVOLUTIONARY LEFT) বলতে পছন্দ করতেন।
২) ১৯৮৯ থেকে সলতে পাকিয়ে ১৯৯১ সালে যাদবপুরে উই দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট বা WTI তৈরি হয়। এই WTI এখনও যাদবপুরে সায়েন্স বিভাগের ক্ষমতায় রয়েছে। এরা নিজেদের স্বাধীন বা অ্যাপলিটিকাল ছাত্র সংগঠন বলে দাবি করতে থাকে। আসলে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে এরা ‘স্বাধীন’ বলেই নিজেদের নিরপদে রাখতে পছন্দ করত।
৩) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাম জমানার শুরু থেকেই লড়াইটা ডিএসএফের সঙ্গে এসএফআইয়ের। আশির শেষের দিকে এসএফআইয়ের কাছে হেরে যায় ডিএসএফ। কিন্তু, এই ডিএসএফ তখনও বামপন্থী। নিজেদের বিপ্লবী বাম বলতে পছন্দ করে। ছিল পিডিএসএফের লোকজনও।
৪) যাদবপুরে SFI এর কাছে ডিএসএএফ হেরে যাওয়ার পর থেকেই বিশেষত ১৯৯৪ সালের পর থেকে ডিএসএফ এর দখল নিতে শুরু করে কালেক্টিভ। এই কালেক্টিভ কারা? চলতি আদর্শের বিরোধিতা করতে শুরু করে তাঁদের এই সংগঠন। কংগ্রেস থেকে বামদল, সবার বিরোধিতা। এরাই ‘কালেক্টিভ’। অচিরেই মেজরিটি হয়ে ওঠে। এখনও একই চিত্র। এদেরই বলা হত অতি বাম। নব্বইয়ের দশকে শুরুর পর থেকে WTI আদর্শের দিক থেকে স্বাধীন থাকলেও ২০১০ সাল থেকে কালেক্টিভদের দৌরাত্ম্য বাড়ে। ২০১১ সাল থেকে পুরোটাই কালেক্টিভের দখলে চলে যায়।
৫) ২০০৫ সাল পরবর্তী সময়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হয় ফরাম ফর আর্টস স্টুডেন্টস বা ফ্যাস। কিছু বিক্ষুদ্ধ SFI, RSF ও কিছু বামপন্থী ছাত্র সংগঠন মিলে তৈরি করে এই সংগঠন। ২০১১ সালে তৈরি হল টিএমসিপি। তখন ফ্যাস ছেড়ে তৃণমূলের লোকজন চলে গেল টিএমসিপিতে। কিন্তু টিএমসিপি বিশেষ সুবিধা করতে পারল না।
৬) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত কয়েকদশকে কোনও সংগঠনের একাধিপত্য ছিল না। বাম ডিএসএফের ক্ষমতা তো নব্বইয়ের দশকের শেষেই তলানিতে। কখনও স্বাধীনরা ক্ষমতায়, কখনও সংসদীয় বাম বা এসএফআই ক্ষমতা। কিন্তু, রাজ্যে পালাবদল, হোক কলরব আন্দোলন অনেক সমীকরণ বদলে দেয়। ২০১৭ সালে প্রথম এসএফআই কালেক্টিভকে হারিয়ে দেয় যাদবপুর আর্টসে। যাদবপুরের ইঞ্জিনিয়রিং ও সায়েন্সের ক্ষমতা এই কালেক্টিভি ডিএএফ ও WTI এর হাতে।
স্বাধীনতা শব্দব্যবহার করে অপকর্মঃ
এককথায় যাদবপুরের একটা নিজস্ব রাজনীতি আছে। এসএফআই, টিএমসিপি, এভিপির মতো ধ্রুপদী রাজনীতির ছত্রছায়ায় ওদের বেড়ে ওঠা নয়। আপাত দৃষ্টিতে বামমনস্ক এবং যাঁরা এই রাজনীতিটি করেন, তাঁরা নিজেদের ‘স্বাধীন’ বলে পরিচয় দেন। তবে এরা যে রাস্ট্রর মূল গঠনতন্ত্রের বিরোধী সেটা পরিস্কার। ২০১০ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে এখানে ছাত্ররা আটকে ছিল। ২০১৪ সালে যখন হোক কলরব আন্দোলন হয়েছিল তখনই এখানকার পড়ুয়ারাই ক্যাম্পাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আসতে বাধ্য করেছিল। এবং এনআরসির সময় তৎকালীন বিজেপি মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে এখানে আসতে বাধ্য করে। এদের সাথে যে ছাত্রসুলভ সৌজন্য যে এরা দেখায় নি তা সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে।
কুনাট্যের ইতিবৃত্তঃ
এদের কান্ডকারখানাও যে সুশীল নয় সেটার সাক্ষী ইতিহাস দেয়।
১) ১৯৭০ সালের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য অধ্যাপক গোপাল চন্দ্র সেন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের কাছে পাঁচজন অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হন।
২) ১৯৭০-এর দশকে ক্যাম্পাসে গান্ধী ভবনে তাণ্ডব ও গান্ধীজির প্রতিকৃতি ধ্বংসের মতো চরমপন্থী ঘটনাবলী ঘটে। বহু ছাত্র আহত হন।
৩) পরবর্তী দশকগুলোতেও দলীয় আধিপত্য কায়েমকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মধ্যে দফায় দফায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
৪) ‘হোক কলরব’ আন্দোলন ও পুলিশি লাঠিচার্জ (২০১৪) ঘটে যখন ক্যাম্পাসে এক ছাত্রীর শ্লীলতাহানির বিচার চেয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন চলাকালীন ২০১৪ সালের ১৬-১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যরাতে তৎকালীন উপাচার্যের নির্দেশে ক্যাম্পাসে পুলিশ প্রবেশ করে।
৫) ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেন হোস্টেলের বারান্দা থেকে পড়ে বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের এক নাবালক ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। পুলিশি তদন্ত ও অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে উঠে আসে তীব্র শারীরিক ও মানসিক র্যাগিং এবং যৌন নির্যাতনের ঘটনা।
সেদিন কি হয়েছিল যাদবপুরেঃ
১৯-২০ আগস্টের মধ্যরাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯-২০ আগস্টের মধ্যরাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এফইটিএসইউ (FETSU)-এর একটি সভাকে কেন্দ্র করে বামপন্থী ও আরএসএস-যুক্ত অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP)-এর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ বাধে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পরে বিজেপি বিরোধী সব বামপন্থী দলগুলি কাছাকাছি আসে ক্ষমতাচ্যুতির ভয়ে। সেই সভায় প্রথমে একজন ও পরে আরো পাঁচজন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের সভ্য-সমর্থক প্রহৃত হন। স্বাভাবিক নিয়মে তারা প্রতিবাদে সামিল হন। বাম দলগুলি (শুধু ছাত্ররা নন তাদের পিতৃস্থানীয় নেতারাও) পালটা প্রতিবাদে সামিল হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমব্লেম খুলে পড়ে যেটার ডিজাইন নন্দলাল বসুর করা। সেক্যু-মাকুরা দায় চাপান এভিবিপি’র ঘাড়ে। তিড়িং তিড়িং করে নৃত্যে মাতেন বেমো-ঘেমো সুশীল সম্প্রদায়, সান্ধ্য টিভিতে কয়েকশ ডেসিবেলে ঝগড়া করা পন্ডিতেরা এবং বিজেপি একশ সিটও পাবে না বলা ভবিষ্যতবক্তারা। কিন্তু বাস্তব কী? বাবরের আমলে ছাত্র থাকা এই বামাচারীরা বুঝতেই চাইছেন না সমস্যা কোথায়?
এভিবিপি’র দাবি কোথায় অযৌক্তিক?
এভিবিপি সে স্বশাসিত স্বাধীন রাস্ট্রবাদী ছাত্র সংগঠন সেটা প্রথমেই এই পন্ডিতদের মাথায় রাখা উচিৎ। বিজেপি’র সাথে এদের মিল একমাত্র রাস্ট্রবাদে। দেশ আগে, দল পরে, ধর্ম আগে (এখানে ধর্ম মানে জাতীয়তাবাদ, প্রচলিত ধর্ম নয়) , ইজম পরে, ন্যাশনালিজম আগে, ইন্টারন্যাশনালিজম পরে, সহনাগরিক আগে, অনুপ্রবেশকারী পরে – এই চিন্তাধারায় মিল আছে। দিনের পর দিন বামপন্থার নামে যে হুলিগানিজম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলেছে তা খবরে প্রকাশিত হলেও কতৃপক্ষ ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা সেখানে বসান নি। বসাতে দেন নি কোন পুলিশ পোস্ট। ভারতীয় সংস্কৃতি বিরোধী বেলেল্লাপনা, নেশা-ভাঙ করা অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে সংবাদ মাধ্যমে। শাসক সরকার কী পদক্ষেপ নেবেন সেটা তাদের বিষয়। এই তান্ডবের প্রচুর বৈদ্যুতিন ছবি উঠেছে। তা দিয়ে পুলিশ তাদের মত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। কিন্তু কতৃপক্ষের কাছে এভিবিপি’র ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট বা অবকাঠামো উন্নয়ন অর্থাৎ পর্যাপ্ত আলো, সিসিটিভি বসানো, পুলিশ পোস্টিং বসানো ও নীতিভিত্তিক হোস্টেল সংস্কার কি খুব অন্যায্য চাওয়া? তার সাথে রাজনীতি গুলিয়ে দেওয়া সিউডো পন্ডিতদের ‘দিমাগী নকশাল’ বলে আখ্যাদান নিয়ে আপত্তি থাকলে তাদের ‘নির্বোধ কুমার’ কি বলা যায় না?