রোজভ্যালির টাকা ফেরাতে এক বছরের রোডম্যাপ! ২১টি হোটেল-সহ সম্পত্তি বিক্রির প্রস্তাব রাজ্যের, নজর হাইকোর্টের দিকে

রোজভ্যালির টাকা ফেরাতে এক বছরের রোডম্যাপ! ২১টি হোটেল-সহ সম্পত্তি বিক্রির প্রস্তাব রাজ্যের, নজর হাইকোর্টের দিকে

দেবপ্রিয়া বারিক: রঙ নিউজ

কলকাতা, ২২ আগস্ট ২০২৬: বছরের পর বছর ধরে রোজভ্যালির কাছে আটকে থাকা টাকা ফেরতের দাবিতে এবার বড় পদক্ষেপের প্রস্তাব সামনে এল। আমানতকারীদের টাকা দ্রুত ফেরাতে রোজভ্যালি গোষ্ঠীর অবশিষ্ট সম্পত্তি বিক্রি করে সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য এক বছরের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করার প্রস্তাব কলকাতা হাই কোর্টের সামনে রেখেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত সম্পত্তির তালিকায় ২১টি হোটেল-সহ বিভিন্ন সম্পদ রয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার—“এক বছরের মধ্যে সব আমানতকারী টাকা পেয়ে যাবেন”—এমন কোনও চূড়ান্ত আদালতের নির্দেশ বা সরকারি ঘোষণা এখনও হয়নি। রাজ্যের বক্তব্য মূলত সম্পত্তি নিষ্পত্তি করে দ্রুত restitution বা টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার একটি প্রস্তাব।

কী প্রস্তাব দিয়েছে রাজ্য?

রোজভ্যালির বিভিন্ন সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে আইনি প্রক্রিয়া এবং Asset Disposal Committee-র তত্ত্বাবধানে রয়েছে। রাজ্যের নতুন প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হল, অবশিষ্ট সম্পত্তিগুলির বিক্রয় প্রক্রিয়াকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিয়ে এসে বিক্রয়লব্ধ অর্থ আমানতকারীদের ফেরতের কাজে ব্যবহার করা।

অর্থাৎ, এখানে সরাসরি সরকারি কোষাগার থেকে প্রত্যেক আমানতকারীকে টাকা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে না। রোজভ্যালির সম্পত্তি থেকে যে অর্থ উদ্ধার হবে, সেটিই আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় দাবিদারদের ফেরত দেওয়ার জন্য ব্যবহার করার পরিকল্পনা।

২১টি হোটেল কেন গুরুত্বপূর্ণ?

রোজভ্যালির সম্পদের মধ্যে হোটেল, জমি, বাড়ি, বাণিজ্যিক সম্পত্তি-সহ বিভিন্ন ধরনের সম্পদ রয়েছে। অতীতেও এসব সম্পত্তির একটি অংশ নিলামের মাধ্যমে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে SEBI ৩০টি রোজভ্যালি সম্পত্তি নিলামে তোলার ঘোষণা করেছিল, যার মোট reserve price ছিল প্রায় ₹৪০৯.০২ কোটি। এর আগে ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও একাধিক সম্পত্তি নিলাম হয়েছিল।

ফলে ২০২৬ সালের নতুন প্রস্তাবকে হঠাৎ শুরু হওয়া কোনও প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘদিনের আদালত-নিয়ন্ত্রিত সম্পত্তি বিক্রি ও restitution ব্যবস্থাকে আরও সময়বদ্ধ করার চেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ইতিমধ্যেই টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে

রোজভ্যালি মামলায় টাকা ফেরতের কাজ একেবারে নতুন নয়। কেন্দ্রের অর্থ মন্ত্রকের ১২ এপ্রিল ২০২৫-এর সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ₹৫১৫.৩১ কোটি Asset Disposal Committee-র হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সরকারি হিসাবে, সেই অর্থ থেকে প্রায় ৭.৫ লক্ষ ভুক্তভোগীকে restitution দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। একই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এর আগে ₹২২ কোটি ব্যবহার করে ৩২,৩১৯ জন বৈধ বিনিয়োগকারীকে টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছিল।

সরকারি নথিতে আরও জানানো হয়, ED তদন্তে রোজভ্যালি গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রায় ₹১৭,৫২০ কোটি সংগ্রহের তথ্য উঠে আসে। তদন্তে অর্থের গতিপথ অনুসরণ করে ২,৯৮৭টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট শনাক্ত ও সংযুক্ত করা হয়েছিল। একইসঙ্গে প্রায় ₹১,১৭২ কোটি মূল্যের অন্যান্য স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তিও সংযুক্ত করা হয়েছিল, যার liquidation-এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছিল।

তাহলে কি এক বছর পরেই সবাই টাকা পাবেন?

এখনই এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না।

কারণ সম্পত্তি বিক্রি হলেই পুরো টাকা সঙ্গে সঙ্গে আমানতকারীদের হাতে চলে যায় না। সম্পত্তির মালিকানা, মূল্যায়ন, নিলাম, ক্রেতার অর্থপ্রদান, আইনি জটিলতা এবং বৈধ দাবিদারদের যাচাই—প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়।

তার উপর, ২০২৫ সালেই কলকাতা হাই কোর্ট রোজভ্যালির Asset Disposal Committee-র কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এবং SEBI-কে কমিটির আর্থিক কার্যকলাপের forensic audit করার নির্দেশ দিয়েছিল। আদালত ১০টি সম্পত্তি বিক্রির মূল্য বাজারদরের তুলনায় যথাযথ ছিল কি না, সেই বিষয়টিও পরীক্ষা করতে বলেছিল।

অর্থাৎ আদালতের কাছে দ্রুততার পাশাপাশি স্বচ্ছতা এবং সম্পত্তির সঠিক মূল্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

আমানতকারীদের জন্য আসল খবর কোথায়?

আসল খবর হল—রোজভ্যালি মামলায় টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া এখন আরও একবার সময়বদ্ধ করার চেষ্টা হচ্ছে। রাজ্যের প্রস্তাব আদালতের অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় নির্দেশ পেলে সম্পত্তি বিক্রির প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হতে পারে।

কিন্তু যতক্ষণ না আদালত এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে চূড়ান্ত নির্দেশ দিচ্ছে এবং সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে পর্যাপ্ত অর্থ বাস্তবে উদ্ধার হচ্ছে, ততক্ষণ “এক বছরের মধ্যে প্রত্যেক আমানতকারী টাকা পেয়ে যাবেন” বলা তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর নতুন আশার আলো

রোজভ্যালিতে টাকা রেখে বহু মানুষ বছরের পর বছর ধরে ফেরতের অপেক্ষায় রয়েছেন। সরকারি উদ্যোগে ইতিমধ্যেই একাধিক দফায় টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া এগিয়েছে। এবার অবশিষ্ট সম্পত্তি দ্রুত বিক্রি করে সেই অর্থ আমানতকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এক বছরের সময়সীমার প্রস্তাব সামনে আসায় মামলায় নতুন গতি আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এখন নজর কলকাতা হাই কোর্টের পরবর্তী নির্দেশের দিকে। রাজ্যের প্রস্তাব আদালত কীভাবে বিবেচনা করে, সম্পত্তি বিক্রির জন্য কী সময়সীমা নির্ধারণ হয় এবং সেই বিক্রয় থেকে কত অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়—এই তিনটি বিষয়ই ঠিক করবে রোজভ্যালি আমানতকারীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান কতটা দ্রুত হবে।

সারকথা:

এক বছরে টাকা ফেরত—এখনও চূড়ান্ত রায় নয়, কিন্তু আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়াকে এক বছরের মধ্যে এগিয়ে নেওয়ার জন্য রাজ্যের নতুন প্রস্তাব। সরকারি হিসাবে ইতিমধ্যেই শত শত কোটি টাকার restitution-এর ব্যবস্থা হয়েছে; এখন অবশিষ্ট সম্পত্তি থেকে আরও অর্থ উদ্ধার করাই বড় লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *