রঙে লেখা স্বদেশের আত্মা: আজ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী

রঙে লেখা স্বদেশের আত্মা: আজ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী

দেবপ্রিয়া বারিক : সিনিয়র রিপোর্টার : রঙ নিউজ

 

আজ, ৭ আগস্ট, ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অনন্য স্মরণীয় দিন। আজই জন্মগ্রহণ করেছিলেন আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী, সাহিত্যিক এবং বঙ্গীয় শিল্পধারার (Bengal School of Art) প্রবর্তক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৭১ সালের এই দিনে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তাঁর জন্ম। শিল্পকে কেবল সৌন্দর্যের উপকরণ নয়, জাতীয় চেতনার ভাষায় রূপ দেওয়ার বিরল কৃতিত্ব তাঁরই।

ব্রিটিশ শাসনের সময় যখন পাশ্চাত্য শিল্পশৈলীর প্রভাব ভারতীয় শিল্পচর্চাকে গ্রাস করছিল, তখন অবনীন্দ্রনাথ ভারতীয় ঐতিহ্য, মুঘল ও রাজপুত শিল্পরীতি এবং প্রাচ্য নন্দনতত্ত্বকে নতুন ব্যাখ্যায় তুলে ধরে এক স্বতন্ত্র শিল্পভাষা নির্মাণ করেন। তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে বঙ্গীয় শিল্পধারা, যা পরবর্তীকালে আধুনিক ভারতীয় শিল্পের ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

অবনীন্দ্রনাথের অমর সৃষ্টি ‘ভারতমাতা’ কেবল একটি চিত্র নয়—স্বদেশি আন্দোলনের আবেগ, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতার স্বপ্নের এক শক্তিশালী প্রতীক। একইভাবে ‘দ্য পাসিং অব শাহজাহান’-এর মতো চিত্রে ইতিহাস, মানবিক বেদনা ও নান্দনিকতার অসাধারণ সমন্বয় দেখা যায়। তাঁর তুলির প্রতিটি আঁচড় যেন ভারতীয় সংস্কৃতির নিজস্ব পরিচয়কে নতুন করে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছে।

শুধু চিত্রকর হিসেবেই নয়, শিশু-কিশোর সাহিত্যের জগতেও অবনীন্দ্রনাথ ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘রাজকাহিনী’, ‘বুড়ো আংলা’ এবং ‘নালক’ আজও বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তাঁর লেখায় যেমন কল্পনার বিস্তার, তেমনই ছিল ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর অনুরণন।

১৯০৭ সালে তিনি Indian Society of Oriental Art প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই প্রতিষ্ঠান ভারতীয় শিল্পচর্চাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করে তুলতে বিশেষ অবদান রাখে এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য একটি সৃজনশীল মঞ্চ তৈরি করে।

আজ তাঁর জন্মজয়ন্তীতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, শিল্পপ্রদর্শনী, আলোচনা সভা এবং চিত্রাঙ্কন কর্মসূচির মাধ্যমে স্মরণ করা হচ্ছে এই মহীরুহকে। সময় বদলেছে, শিল্পের মাধ্যমও বদলেছে; কিন্তু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা আজও একই কথা মনে করিয়ে দেয়—একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় তার সংস্কৃতি, সৃজনশীলতা এবং আত্মমর্যাদার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

আজকের দিনে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং ভারতীয় শিল্পের আত্মপরিচয়, স্বদেশচেতনা এবং সৃজনশীল স্বাধীনতার সেই দীপ্ত উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *