স্যালুট স্যার !

স্যালুট স্যার

 

শাশ্বতী মোদক , রঙ নিউজ

 

স্কুলের ঘণ্টাটা সেদিন ক্লাস শুরু করার জন্য বাজেনি। বেজেছিল জীবন বাঁচানোর জন্য। ২৬ আগস্ট, নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকার একটি স্কুলে অন্য দিনের মতোই চলছিল ক্লাস। স্কুলে তখন প্রায় ১,৬৪৩ জন ছাত্রছাত্রী। কেউ পড়াশোনা করছিল, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছিল। কেউই জানত না, কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তাদের চারপাশে নেমে আসতে চলেছে ভয়ংকর এক বিপর্যয়।হঠাৎ স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি খবর পেলেন উজানের একটি গ্রাম নদীর স্রোতে ভেসে গেছে। সেই ভয়ংকর জল, কাদা আর পাথরের স্রোত দ্রুত নেমে আসছে। তিনি আর অপেক্ষা করেননি। সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে সবাইকে সতর্ক করেন। শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে দ্রুত নিরাপদ, উঁচু জায়গায় সরে যেতে শুরু করেন।

তারপর তিনি স্কুলবাসের চালকদের ফোন করে স্কুলের কাছে আসতে বারণ করেন। কিন্তু একটি স্কুলবাস তখন রাস্তায়। বাসটি নদীর ওপরের একটি ব্রিজের দিকে এগিয়ে আসছিল। রাজেন্দ্র তাকে ফিরে যেতে বলেন। বাসটি কোনওরকমে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার পরপরই ব্রিজটি ভেঙে পড়ে।

এরপর যে দৃশ্য তৈরি হলো, তা যেন কোনও সিনেমার দৃশ্য। প্রচণ্ড জল, কাদা, পাথর আর ধ্বংসাবশেষ এসে আছড়ে পড়ল স্কুলের ওপর। তিনতলা স্কুলবাড়িটি মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত পুরো স্কুলটাই ভেসে গেল যেখানে কিছুক্ষণ আগেও ১,৬৪৩ জন শিশুর জীবন স্বাভাবিক গতিতে চলছিল। কিন্তু শিশুগুলো

সবাই বেঁচে গেল। ১,৬৪৩ জনই। একবার সংখ্যাটা ভাবা যাক। ১,৬৪৩ জন মানে শুধু ১,৬৪৩ জন ছাত্রছাত্রী নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১,৬৪৩টি পরিবার, ১,৬৪৩টি মায়ের অপেক্ষা, ১,৬৪৩টি বাবার স্বপ্ন আর ১,৬৪৩টি ভবিষ্যৎ।

 

সেদিন স্কুলের তিনতলা বিল্ডিংটা বাঁচেনি। ব্রিজটা বাঁচেনি। স্কুলের কোনও স্মৃতিই হয়তো আগের মতো নেই। কিন্তু ১,৬৪৩টা জীবন বেঁচে গেছে। আর সেই কারণেই আজ রাজেন্দ্র দাওয়াদির গল্পটা শুধু একজন শিক্ষকের গল্প নয়। এটা মনে করিয়ে দেয়—বিপদের মুহূর্তে কখনও কখনও বাঁচা আর না-বাঁচার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে মাত্র কয়েক মিনিটের একটি সঠিক সিদ্ধান্ত।

 

তিনি হয়তো সেদিন নায়ক হওয়ার কথা ভাবেননি। তিনি শুধু বুঝেছিলেন—সময় নেই, এখনই কিছু একটা করতে হবে।

 

আর তাঁর সেই সিদ্ধান্তের কারণেই আজ ১,৬৪৩ জন শিশু বেঁচে আছে।

 

কখনও কখনও একজন মানুষের সাহস শুধু একটা জীবন বদলায় না—একটা গোটা প্রজন্মকে বাঁচিয়ে দেয়।

রাজেন্দ্র দাওয়াদি—আপনাকে স্যালুট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *