২৮২ বছরে পা দিল পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির পুজো
সোমনাথ মুখোপাধ্যায়:Rong News
এসে গিয়েছে বাঙালির সম্বৎসরের সব থেকে বড়ো উৎসব দুর্গাপুজো। অসংখ্য বারোয়ারি পুজোর পাশাপাশি নজরকাড়া বনেদি বাড়ির পুজোর মধ্যে উত্তর হাওড়ার সালকিয়ার বাবুডাঙ্গা এলাকায় ‘সালিখা হাউস’-র ঐতিহ্যবাহী দুর্গোৎসবের ঠাকুর দালানে পা রাখলেই যেন মনে হয় ‘একটু জায়গা দাও মায়ের মন্দিরে বসি’। কারণ এই বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা সঙ্গীত জগতের অন্যতম নক্ষত্র প্রবাদপ্রতিম গীতিকার বহু কালজয়ী গানের স্রষ্টা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। ১৯৯৯য়ে তিনি ইহলোকের মায়া কাটালেও আজও এ বাড়ির প্রতিটি ইটের খাঁজে উদ্বেল করা গানের অনুরণন।

এ বছর ২৮২ বছরে পা দিল বাবুদের বাড়ির পুজো বলে খ্যাত সালিখা হাউসের দুর্গোৎসব। প্রায় ৩০০ বছর আগে এলাকায় বসতভিটে স্থাপন করেন বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের পূর্বপুরুষ জমিদার রাধামোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর শুরু করা দুর্গাপুজোই পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে আজও চালিয়ে আসছেন উত্তরপুরুষরা। এই পরিবারের কৃতি সন্তান প্রখ্যাত গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সময়ে জাঁকজমক করে পুজো হতো। অতিথি অভ্যগতদের সমাগমে পুজোর আঙিনা থাকত জমজমাট। বর্তমানে সেই পুজোর জৌলুস বেশ কিছুটা ফিকে হয়ে গেলেও সমস্ত রকম রীতিনীতি মেনে পরিবারের ধারা এখনো বজায় রেখেছেন প্রয়াত গীতিকারের উত্তরসুরি ভাইপো সুস্মিত বন্দ্যোপাধ্যায়, নাতি সম্পদ বন্দ্যোপাধ্যায়রা।
বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের তরফে সুস্মিত বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, মহালয়ার পরেই পুজোর বোধন শুরু হয়ে যায়। ষষ্ঠীতে বেল বরণ, সপ্তমীতে কলাবৌ স্নান, অষ্টমীর সকালে কুমারী পুজো, সধবা পুজো, বিকালে ধুনো পোড়ানো হয়। সময় মিলিয়ে হয় সন্ধিপুজো। প্রতিদিন হয় চণ্ডীপাঠ। পুজোর বিষয়ে সুস্মিত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, নবমীতে আগে মহিষ বলি হতো। এখন ফল বলি হয়। তিনি আরোও বলেন, দশমীতে বাড়ির মহিলাদের তৈরি করা পান্তা ভাত, চালতা দিয়ে মুসুর ডাল, কচুর শাক, চচ্চড়ি, পোড়া ল্যাটা মাছের বিশেষ বাসি ভোগ নিবেদন করা হয় মাকে। প্রতিমা নিরঞ্জন হয় সালকিয়ার গঙ্গায় পরিবারের নিজস্ব ঘাট ‘ব্যানার্জি ঘাটে’।

পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে কেমন পুজো হতো সে বিষয়ে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো সুস্মিত বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ‘পুজো হতো জমজমাট। পুজো উপলক্ষে বহু বিশিষ্ট মানুষ আসতেন। বৈঠকখানায় চলত দেদার আড্ডা, খাওয়াদাওয়া, গানের অনুষ্ঠান। এখানে বসেই বহু হিট পুজোর গান লেখেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।’ সেইসব গান যা আজও বাঙালির আবেগকে উস্কে দেয় বারবার। তিনি আরও জানান, ‘এখানে একাধিকবার এসেছেন মহানায়ক উত্তম কুমার। তিনি এখানে গান গেয়েছেন, ছাদে ঘুড়ি উড়িয়েছেন। এসেছেন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী অপরেশ লাহিড়ী। তাকে তবলায় সঙ্গত করেছেন পুত্র বাপি লাহিড়ী।’ তাঁর কথায়, ‘আমাদের এই বৈঠকখানায় অনেক ভালো ভালো গানের সৃষ্টি হয়। এখানেই বসে কাকামণি গান লিখতেন। শিল্পীরা আসতেন। সুর দিতেন সুরকাররা। মহড়া হতো।’ সুস্মিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র সম্পর্কে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাতি সম্পদ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘ছোটো থেকেই দাদুর কথা শুনে আসছি। যদিও ওনাকে দেখিনি কিন্তু ওনার নামের খ্যাতি চারিদিকে শুনতে পাই। ওনার গান শুনি। আমাদের প্রজন্ম ওনার গান শুনছে। দাদুর সময়ে পুজোয় খুব হইহুল্লোড় হতো বলে শুনেছি। অনেক নামী মানুষরা আসতেন। উত্তম কুমার অনেকবার এসেছেন এখানে। এই বাড়ি উত্তম কুমারের মামার বাড়ি বলে খ্যাত।’ তিনি আরোও বলেন, ‘আমার বাবা একাই চেষ্টা করছেন পুজোটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার। শরিকরা এখন কেউ আর নেই। বাড়িও পুরনো হয়েছে। মেরামতি করে চলছে। চেষ্টা চলছে যতদিন এই ঐতিহ্য বজায় রাখা যায়।’
আগামী দিনে পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রেখে, সমস্ত রকম শাস্ত্রীয় আচার ও রীতিনীতি মেনে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের দুর্গাপুজো চালিয়ে যাওয়া হবে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।

‘মুকুটটা তো পড়ে আছে, রাজাই শুধু নেই!’ পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় চলে গিয়েছেন। চলে গিয়েছে সে সময়ও। আছে শুধু বনেদিয়ানার সাবেক ঐতিহ্য বহন করে চলার চেষ্টা। আসলে বেহাগ, বসন্ত না থাকলেও ইমন এখনো আসর মাতিয়ে রেখেছে!
Sub Editor- Ramananda Das
Editor- Dibyendu Das
Editor in chief- Rakesh Sharma
