শিক্ষাক্ষেত্রে অভূতপূর্ব এক বিরাট ধাক্কা
সুদীপ্ত কুমার চক্রবর্তী , রঙ নিউজ
বিগত কয়েক বছর ধরে এ রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ে লোফালুফি অব্যাহত। সীমাহীন দুর্নীতির যে ঝড় বঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রকে তছনছ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে তারই বিরাট এক ধাক্কায় একসাথে চাকরি গেল প্রায় ছাব্বিশ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীর। এ যে কি অপরিমেয় ক্ষতি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এরা অনেকেই ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরীক্ষক। মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা দেখা শেষ হয়ে গেলেও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা দেখা এখনো বাকি রয়েছে। চাকরি হারানো শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছ থেকে এখনো পর্যন্ত অমূল্যায়িত খাতাগুলি চেয়ে পাঠানোর জন্য প্রধান পরীক্ষকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই খাতা এখন কারাই বা দেখবেন এবং দ্রুত দেখতে গিয়ে সেগুলির মূল্যায়ন কি রকম হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। বিদ্যালয়গুলিতে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে প্রথম পর্যায়কালীন অভীক্ষা। বিরাট সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অভাবে পরীক্ষা চলবে কিভাবে? উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের নির্দেশ অনুসারে দ্বাদশ শ্রেণির পঠন পাঠন শুরু করতে হবে খুব শিগগিরই। কারা পড়াবেন? এমনিতেই মুর্শিদাবাদ জেলা পিছিয়ে পড়া হিসেবে চিহ্নিত, যদিও জানিনা এত বছরের মধ্যেও তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব হলো না কেন। অনেক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা এমনিতেই পড়াশোনার প্রতি বিমুখ। এখন এই অবস্থায় শিক্ষা দীক্ষা যে সম্পূর্ণ লাটে উঠবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নাই। বেশ কিছু বিদ্যালয়ে কোনমতেই পঠন পাঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কী হবে সেই সব বিদ্যালয়ের উপর নির্ভর করা ছাত্র-ছাত্রীদের, বিশেষ করে যাদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল? এ তো গেল ছাত্র-ছাত্রীদের দিক। এবার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দিকটি বিচার করতে গেলে মাথা খামচানো ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। ‘হবুচন্দ্র রাজা আর গোবুচন্দ্র মন্ত্রী’র গল্পে পড়েছিলাম, যে রাজ্যে মুড়ি মিছরির একদর সে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য। সেই ছবিটাই খুব স্পষ্ট ভাবে প্রতীয়মান আমাদের রাজ্যে। যোগ্য অযোগ্যকে মাপা হচ্ছে এক দাঁড়িপাল্লায়। কিছুতেই সম্ভব হলো না অযোগ্যদের চিহ্নিত করা। ফলে বিনা দোষে চাকরি গেল হাজার হাজার যোগ্য শিক্ষক শিক্ষিকার। কী করে চলবে তাদের সংসার? হয়তো অনেককেই বেছে নিতে হবে আত্মহননের পথ, যদিও তাতে বাতানুকূল ঘরে বসে দূরবিনে বাস্তবকে দেখতে চাওয়া ব্যক্তিদের কিছু যায় আসে না। মানুষের চোখের জল তাদের বিচলিত করতে পারেনা। অনেকটা তাদের ‘স্থিতপ্রজ্ঞ’ দশা। মানুষের জীবনকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা যাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে তারা বিবেককে যে বহুদিন আগেই শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করেছে তা বলা বাহুল্য। বেশ কয়েকজন পরিচিত শিক্ষক-শিক্ষিকা জানতে চাইছিলেন, রোজগার তো গেলই, সমাজের কাছে তারা মুখ দেখাবেন কী করে? এ এক ভয়াবহ চিত্র। সরকারি দুর্নীতির কারণে একসঙ্গে এতজনের চাকরি চলে যাওয়ার মত দুর্ভাগ্য এর আগে কোথাও হয়েছে কিনা আমি অন্তত জানিনা। যদিও এই চোখের জলকে ভোট ব্যাঙ্কে পরিণত করার চেষ্টায় এর মধ্যে নেমে পড়েছেন কলাকুশলীরা। একটা বিরাট প্রজন্ম একেবারে তছনছ হয়ে যাচ্ছে। তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। সরকারি বিদ্যালয়গুলিকে সুউন্নত করার বিন্দুমাত্র আগ্রহ সরকারের নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে তা তো অবনমনের খাদে গিয়ে পৌঁছবে। শেষ কোথায়? কে জানে? একটি আশাব্যঞ্জক গানের লাইন মনে পড়ছে, “আসবেই ভোর আসবেই”। কিন্তু এই প্রবল অন্ধকারাচ্ছন্নতায় ধীরে ধীরে হতাশা গ্রাস করছে। মনে প্রশ্ন আসছে,“সত্যিই ভোর আসবে তো?”
সুদীপ্ত কুমার চক্রবর্তী , রঙ নিউজ
