“কজনায় হৃদয় দিয়ে গাইতে জানে!”
(সংগীত শিল্পী মান্না দে-র জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ)
সোমনাথ মুখোপাধ্যায়: Rong News
শচীন কর্তা ‘মানা’ নামে ডাকতেন। সংগীত জগতের অন্যতম কিংবদন্তি শচীন দেব বর্মণের দেওয়া মানা নামটাই শেষ পর্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে গেল। পিতৃদত্ত নাম প্রবোধ চন্দ্র দে বড়ো একটা কেউ জানল না। তিনি হয়ে উঠলেন আসমুদ্রহিমাচলের জনমানসের হৃদয়তন্ত্রীতে দোলা দেওয়া মান্না দে। ব্যতিক্রমী গায়নশৈলীর স্বকীয়তায় একছত্র সম্রাট।
সাবেক উত্তর কলকাতার সিমলা স্ট্রিট সংলগ্ন ৯ নম্বর মদন ঘোষ লেনের দে বাড়িতে জন্ম মান্না দের। সালটা ১৯১৯র ১ লা মে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই সংগীতের প্রতি দুর্বার আকর্ষণ। গান গেয়ে মাতিয়ে দেওয়া বন্ধুদের। পরবর্তীতে স্কটিশ চার্চ কলেজে উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি গোয়াবাগানে প্রখ্যাত কুস্তিগির গোবর গোহর আখড়ায় কুস্তি বা দল বেঁধে ফুটবল খেলা, হইহই করে ছাদ থেকে আকাশে ঘুড়ির লড়াই সংগীতের চর্চায় কখনো ছেদ পড়েনি তাঁর। সংগীতের সঙ্গেই যে প্রথম প্রেম। এক অচ্ছেদ্য বন্ধন। আলাপ ধরে, তান বিস্তার করে আবার তো সেই সমে এসে পড়া!
কাকা প্রখ্যাত শিল্পী কৃষ্ণচন্দ্র দে ছিলেন তাঁর গুরু। পরে ওস্তাদ দবির খাঁয়ের কাছে নাড়া বাঁধেন মান্না। কলেজে সংগীত প্রতিযোগিতায় পরপর তিনবার তিনটি আলাদা বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন মান্না দে। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নেন ওস্তাদ আমান আলি খাঁ ও ওস্তাদ আবদুল রহমান খাঁয়ের কাছে।
প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি গান গেয়েছেন মান্না দে।গেয়েছেন বাংলা, হিন্দি, মারাঠি প্রভৃতি চব্বিশটি ভাষায়। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল গুপ্ত, নচিকেতা ঘোষের মতো দিকপাল সব গীতিকার সুরকারদের সঙ্গে কাজ করেছেন। সাগরপারে মুম্বইতে নৌসাদ, মজরুহ সুলতানপুরি, মদনমোহন, শঙ্কর জয়কিষেন, লক্ষ্মীকান্ত প্যারেলাল, শচীন দেব বর্মণ গান গেয়েছেন প্রায় সকলের কথায় ও সুরে। একক ছাড়াও ডুয়েট গেয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, রফি সাহেব বা মুকেশের সঙ্গে। লতা মঙ্গেশকর, গীতা দত্তের সঙ্গে অসংখ্য ছায়াছবিতে নেপথ্য শিল্পী হিসাবে কাজ করেছেন। ধ্রুপদী থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত, আধুনিক থেকে ছায়াছবির গান সুরে ভিজিয়েছেন অসংখ্য মানুষের মন। তাঁর সুরের মূর্ছনা বারবার শান্তির অভিনিবেশে শান্ত করেছে অসংখ্য চিত্তের দগ্ধ বালুচর। পেয়েছেন অকুন্ঠ ভালোবাসা ও সম্মান। ষাট বছরের সংগীত জীবনে ১৯৭১এ ভারত সরকারের থেকে পেয়েছেন পদ্মশ্রী। ২০০৫য়ে পদ্মভূষণ সম্মাননা ও ২০০৭য়ে দাদাসাহেব ফালকে। ২০১১য়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে বঙ্গভিভূষণ। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দিয়েছে সাম্মানিক ডি লিট্। ২০১৬য়ে তাঁর সম্মানে ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে।২০১৯য়ে জন্মশতবর্ষে পৈত্রিক বাসভবনের সামনে তাঁর আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
আক্ষরিক অর্থেই এক বিরল ও ব্যতিক্রমী শিল্পী মান্না দে। রেওয়াজ ছাড়া একদিনও থাকতে পারতেন না। কখনো বলেননি যে তিনি ‘গাইতে জানেন!’ বরং শিল্পীচিত বিনয়ে বিচারের ভার মানুষের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। আজ তিনি নেই। কিন্তু আছেন প্রবলভাবেই। আছেন অসংখ্য গুণমুগ্ধদের মনে ‘নিরালায় বসে স্মরণবিণ বেঁধে!’ জীবনের জলসাঘরে অগণিত মণিমাণিক্য কিন্তু তিনি যে ‘তার ঠিকানা রাখেননি’! সুরলোকে আজ সুরসাগর। তাঁর ‘মুকুটটা তো পড়ে আছে, রাজাই শুধু নেই’।।
সাব এডিটর – অনুরাধা ভট্টাচার্য্য শর্মা, সোমনাথ মুখোপাধ্যায়,প্রতীক চ্যাটার্জী
ম্যানেজার – বুবুন মাইতি
এডিটর – দিব্যেন্দু দাস
এডিটর ইন চিফ – রাকেশ শর্মা
