সুখকর্তা দুখহর্তা গণেশ
(গণেশ চতুর্থী উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ)
সোমনাথ মুখোপাধ্যায়:Rong News
সে কতকাল আগের কথা। কৈলাশে নিভৃত স্নানাগারে স্নান করছেন শিব পত্নী দেবী পার্বতী। তাঁকে সহায়তা করছেন দুই সখী জয়া ও বিজয়া। স্নানের সময় নিজের গাত্রমল থেকে একটি ছোট্ট পুতুল তৈরি করে ফেললেন দেবী পার্বতী। করলেন প্রাণ প্রতিষ্ঠা। পুত্র স্নেহে আদর করে নাম রাখলেন গণেশ। দিনটি ভাদ্র মাসের শুক্ল পক্ষের চতুর্থী তিথি। কাঁচা হলুদের আভা যুক্ত গাত্রবর্ণ পরম রূপবান সেই দেবশিশু। নিজের স্নানাগারের প্রবেশদ্বারে গণেশকে পাহারায় নিযুক্ত করলেন তিনি। মাতৃ আজ্ঞা শিরোধার্য। ফলে স্নানাগারে প্রবেশের মুখে স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেবকে আটকালেন গণেশ। রাগে অগ্নিশর্মা শিবের সঙ্গে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ শুরু হলো গণেশের। একদিকে শূলপাণি জগতের সংহারকর্তা শিব। অপর দিকে মাতৃভক্তিতে বলীয়ান অটল গণেশ। সেই মহারণে যুযুধান গণেশের মাথা কেটে ফেললেন শিব। প্রবল শোকার্ত হলেন পুত্রহারা পার্বতী। তারপর ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে জগৎসংসার ধ্বংস করতে উদ্যত হলেন সমগ্র জগতের পরম শক্তিরূপীনি আদ্যাশক্তি মহামায়া। ছুটে এলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা, পালনকর্তা ভগবান বিষ্ণু। এলেন অন্যান্য দেবতারাও। সকলের কাতর প্রার্থনায় কিছুটা শান্ত হলেন পার্বতী। শিবের আদেশে ছুটল প্রমথ বাহিনী। উত্তর দিকে মাথা করে বিশ্রামরত দেবরাজ ইন্দ্রের বাহন ঐরাবত হাতির মাথা এনে দিল নন্দীর নেতৃত্বে প্রমথরা। সেটি গণেশের দেহে যথাযথ ভাবে প্রতিস্থাপনের কাজ করে তার প্রাণ ফিরিয়ে দিলেন শিব। এত সুন্দর ছেলের কিনা শেষে গজ মস্তক! পার্বতীর ক্ষোভের সীমা নেই। তাঁকে শান্তনা দিয়ে দেবতারা ঘোষণা করলেন যে সব দেবদেবীর পুজোর সর্বাগ্রে হবে পার্বতীতনয় গণেশের পুজো। তাই তো গণেশের পুজো হয় সবার আগে।
এ তো গেল শিবপুরাণের কথা। এবার চোখ রাখা যাক গণেশের রূপের প্রতি। গণেশ সকলের প্রিয়। কত তাঁর নাম। গজ মস্তক তাই তিনি গজানন। গণের অধিপতি তাই তিনি গণপতি বা গণনাথ। সকল বাধা বিঘ্ন দূর করেন তাই তিনি বিঘ্নেশ। গণেশের পুজো করলে সমস্ত কর্মে সিদ্ধিলাভের সহায়ক হয়। তাই তিনি সিদ্ধিদাতা। তাঁর শুঁড় বামাবর্ত বা বাম দিকে থাকলে তিনি বিনায়ক। দক্ষিণাবর্ত শুঁড় থাকলে সিদ্ধিবিনায়ক। ভক্তের সকল চিন্তা দূর করেন তাই তিনি চিন্তামণি। ক্ষাত্রতেজা ব্রাহ্মণ পরশুরামের সঙ্গে যুদ্ধে তাঁর একটি দাঁত ভেঙে যায়। তাই তিনি একদন্ত। বিরাট চেহারায় বিরাট পেটের কারণে তিনি মহাকায় ও লম্বোদর নামে প্রসিদ্ধ। গজ মস্তক ধীশক্তি ও বুদ্ধির প্রতীক। ছোটো মুখ সংযমের প্রতীক। বড়ো বড়ো দুটি কান ধীরস্থির শ্রোতার প্রতীক। ভক্তের প্রার্থনা মনোযোগী হয়ে শুনে তার কাঙ্খিত ফল দেন রজোগুণের আধার ভক্তবান্ছা কল্পতরু গণেশ। কখনো তাঁর হাতে নারায়ণের মতো শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম, কখনো কুঠার, পাশ, অঙ্কুশ। অস্ত্র দ্বারা ভক্তের অজ্ঞান নাশ করে তাকে বরাভয় দিচ্ছেন গণেশ। মোদক, লাড্ডু গণেশের অতি প্রিয়। এগুলি সাধনালব্ধ ফলের ইঙ্গিতবাহী। বাহন মূষিক বা ইঁদুর কর্মে দ্রুততার পরিচায়ক।
ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থীতে ধূপ, দীপ, রক্তবর্ণের পুস্প যেমন রক্তজবা, লাল চন্দন, পীতবর্ণ বা হলুদ রংয়ের বস্ত্র সহ গণেশের পুজো করলে সমস্ত কর্মে সিদ্ধিলাভের সহায়ক হয়। কাঙ্খিত ফল মেলে। দুর্বা গণেশের অতি প্রিয় ও আবশ্যক উপচার। তাই জবার মালার সঙ্গে দুর্বার মালা পরিয়ে যথাযথ ভক্তি সহকারে পুজো করলে খুশি হয়ে তাঁর ভক্তের দুঃখ হরণ করে তাকে সুখ প্রদান করেন সুখকর্তা, দুখহর্তা গণেশ।
সাব এডিটর – অনুরাধা ভট্টাচার্য্য শর্মা, সোমনাথ মুখোপাধ্যায় , প্রতীক চ্যাটার্জী
এডিটর – দিব্যেন্দু দাস
এডিটর ইন চিফ – ড: রাকেশ শর্মা
