১২ বছর বয়সে অ্যাসিড হামলা, ৩৭ অস্ত্রোপচার পেরিয়ে পদ্মশ্রী
শাশ্বতী মোদক, রঙ নিউজ
‘কাশীর লতা’ মঙ্গলা কাপুরের জীবনসংগ্রাম হয়ে উঠল অনুপ্রেরণার প্রতীক।
মাত্র শৈশবেই ভয়াবহ অ্যাসিড হামলায় বদলে গিয়েছিল তাঁর জীবন। শরীরের উপর নেমে এসেছিল নির্মম আঘাত, দীর্ঘ চিকিৎসা, একের পর এক অস্ত্রোপচার এবং সমাজের নানা কটূক্তি। কিন্তু সেই ক্ষত তাঁর স্বপ্নকে থামাতে পারেনি। বরং যন্ত্রণাকেই শক্তিতে পরিণত করে শিক্ষা ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন বারাণসীর বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর মঙ্গলা কাপুর। ২০২৬ সালে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেছে ভারত সরকার।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলা কাপুর ১৯৫৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে ১৯৬৫ সালে অ্যাসিড হামলার শিকার হন তিনি। সেই ভয়াবহ ঘটনার পর দীর্ঘ চিকিৎসা ও একাধিক অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর প্রায় ৩৭টি অস্ত্রোপচারের কথাও উঠে এসেছে।
তবে শারীরিক যন্ত্রণা কিংবা প্রতিকূলতা কোনও কিছুই তাঁর শিক্ষার পথ রুদ্ধ করতে পারেনি। তিনি Banaras Hindu University (BHU) থেকে সঙ্গীতে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। সঙ্গীতের পাশাপাশি গবেষণাতেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। BHU থেকেই তিনি সঙ্গীতে Ph.D. অর্জন করেন এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের Gwalior Gharana-র বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
শুধু শিল্পী হিসেবেই নয়, শিক্ষাবিদ হিসেবেও তাঁর অবদান দীর্ঘ ও উল্লেখযোগ্য। তিন দশকেরও বেশি সময় BHU-র সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি সঙ্গীত শিক্ষা, গবেষণা, পাঠক্রম উন্নয়ন এবং একাডেমিক প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১৯ সালে Professor এবং Head of the Department of Music পদ থেকে অবসর নেন তিনি।
সঙ্গীতচর্চার জগতে মঙ্গলা কাপুর পরিচিত ‘কাশীর লতা’ নামে। তাঁর কণ্ঠ, সাধনা এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছে। তিনি শুধু মঞ্চের শিল্পী নন, সঙ্গীতকে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও সমৃদ্ধ করেছেন। সরকারি Padma Awards নথিতেও তাঁকে বিশিষ্ট Indian classical vocalist, musicologist এবং academician হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অবসর গ্রহণের পরও তাঁর কর্মযাত্রা থেমে থাকেনি। সমাজের প্রান্তিক ও বিশেষভাবে সক্ষম মানুষদের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যদের অনুপ্রাণিত করার কাজেও তিনি যুক্ত রয়েছেন। তাঁর নিজের জীবনসংগ্রামই হয়ে উঠেছে বহু মানুষের কাছে আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার বার্তা।
সংগ্রামের স্বীকৃতি পদ্মশ্রী
২০২৬ সালের পদ্ম পুরস্কারের তালিকায় Ms. Mangala Kapoor-এর নাম রয়েছে Literature and Education বিভাগে। রাষ্ট্রীয় এই সম্মান তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাজীবন, সঙ্গীতচর্চা, গবেষণা ও সমাজে অবদানের স্বীকৃতি।
মঙ্গলা কাপুরের জীবন তাই শুধুমাত্র অ্যাসিড হামলা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নয়। এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ লড়াই, যেখানে ক্ষতকে পরিচয় না বানিয়ে প্রতিভা, শিক্ষা ও কর্মকে নিজের পরিচয়ের ভিত্তি করেছেন তিনি।
যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খেলনা আর স্বপ্ন—সেই বয়সেই তাঁর জীবনে নেমে এসেছিল ভয়াবহ বিপর্যয়। কিন্তু সেই আঘাত তাঁর স্বপ্নকে হত্যা করতে পারেনি। সঙ্গীত হয়ে উঠেছে তাঁর আত্মপ্রকাশের ভাষা, শিক্ষা হয়েছে তাঁর শক্তি, আর অধ্যবসায় তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে জাতীয় সম্মানের মঞ্চে।
মঙ্গলা কাপুরের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শরীরের ক্ষত একজন মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; মানুষের সাহস, প্রতিভা, শিক্ষা ও কর্মই শেষ পর্যন্ত তার পরিচয় নির্মাণ করে।
