“রামদাস কো রাম মিলা”

Views: 198
2 0

“রামদাস কো রাম মিলা”

 

✍🏾সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

রঙ নিউজ।

“বেটা তুম জরুর যোগীরাজ বনোগে!” সাধুর বলা কথাগুলি মনে কী এক অদ্ভুত দোলা দিয়ে গেল ১৮০০ সালের ২৪শে জুলাই অবিভক্ত পাঞ্জাবের লোনাচামারি গ্রামের ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া কিশোরটির মনে! অখ্যাত পরিব্রাজক সেই সাধুর কথাই সত্যি হলো একদিন। তপোভূমি ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিকতার ইতিহাস পেল নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের মহান বৈষ্ণব সাধক রামদাসকে, জনমানসে যিনি রামদাস কাঠিয়াবাবা বলেই সমধিক পরিচিত। তিনিও তো তাই বলতেন-“সাধু কা বাত কভি ঝুট্ নেহি হোতা!” সাধু বাক্য কখনো মিথ্যে হয় না। প্রকৃত সাধুর বলা কথা সত্যি হবেই।

ঘুরে বেড়ায় রামদাস। কখনো তীর্থক্ষেত্রে গিয়ে ধ্যানে বসে তো কখনো নির্জন পাহাড়ি স্থানে বসে একমনে জপ করে যায়। মনে দৃঢ় সংকল্প ঈশ্বরকে পাওয়া। কিন্তু কে তাকে সেই পথের সন্ধান বলে দেবে? কেই বা সঠিক সাধনার পথ দেখাবে? কোথায় তার গুরু? মনে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে শুধুমাত্র গায়ত্রী জপ করেই জপসিদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় রামদাস। কঠোর সাধনায় মানসপটে মা গায়ত্রীর দর্শন করে তাঁর আশীর্বাদধন্য হয়ে ফের বেরিয়ে পড়ে চিরকাল সাধকদের হাতছানি দিয়ে ডাকা দেবতাত্মা হিমালয়ের কোলে। খুঁজতে থাকে তার গুরুকে। হঠাৎ এক পাহাড়ের ফাটলে এক বৃদ্ধ সাধককে খুঁজে বের করে ফেলে রামদাস। অস্থিসার, লোলচর্ম অতি প্রাচীন এক সাধু। বয়সের ভার এতটাই যে চোখের পাতা নেমে এসে ঢেকে দিয়েছে তাঁর দুই চোখ। রামদাসকে দেখে রাগে অগ্নিশর্মা হলেন সেই প্রাচীন সাধু। “তু কৌন হ্যায়?” প্রশ্নের উত্তরে “আপকা চেলা হুঁ মহারাজ” বলে রামদাস। আমার চেলা! বটে! তাহলে ঝাঁপ দে দেখি পাহাড়ের ওপর থেকে নিচের ওই খরস্রোতা নদীতে। তবেই তো বোঝা যাবে তুই আমার চেলা হওয়ার উপযুক্ত কিনা! বিনা বাক্যব্যায়ে পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিলেন রামদাস। কিন্তু কী আশ্চর্য! নিচে পড়ার আগেই যেন বলিষ্ঠ হাতে তার চুলের মুঠি ধরে ফের পাহাড়ি গুহার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল! হতভম্ব রামদাসের গায়ে হাত বুলিয়ে হাসিমুখে সেই প্রাচীন সাধু বলেন, তাঁর শিষ্য হওয়ার যোগ্যতা আছে রামদাসের তবে তিনি তার গুরু নন। আর এই জায়গা এক গোপন প্রাচীন তপোবন। এখানে বেশিক্ষণ থাকা রামদাসের পক্ষে ঠিক নয়। পাহাড়ের নিচেই রয়েছেন রামদাসের গুরু। তিনি নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের দেবদাস কাঠিয়াবাবা মহারাজ। সাধুকে প্রণাম করে পাহাড় থেকে নেমে ইহকাল পরকালের পরম আশ্রয় তাঁর গুরু দেবদাসজি মহারাজকে পেয়ে গেলেন রামদাস। মন্ত্রদীক্ষার পর কঠিন, কঠোর কৃচ্ছসাধনের মধ্যে দিয়ে সাধনপথে এগিয়ে চললেন রামদাস। গুরুর নির্দেশে ইন্দ্রিয় জয়ের জন্য সবসময় কাঠের তৈরি আড়বন্ধ কটিবাস পরে থাকার ফলে পরবর্তী সময়ে তাঁর নাম হয়ে যায় রামদাস কাঠিয়াবাবা। এই কাঠের কটিবাস পরে মাটিতে শুতে পারতেন না রামদাস। কটিবাস শুদ্ধু কোমরটা বালিতে গুঁজে সামান্য সময়ের জন্য বিশ্রাম নিতেন তিনি।

গুরু দেবদাসজির কঠোর তত্ত্বাবধানে সাধনপথে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চললেন শিষ্য রামদাস। গুরুর নির্দেশে চলে গেলেন হিমাচলের কাংড়া উপত্যকায় প্রসিদ্ধ সতীপীঠের অন্যতম জ্বালামুখীতে। কথিত যে সতীর জিভ পড়ে এখানে যার প্রকাশ অনির্বাণ আগুনের জ্যোতি মা জ্বালামুখী। এখানে মহাযোগী গোরক্ষনাথের পদধূলিধন্য গোরখ্ ডিব্বায় তাঁর সাধন আসনে বসে ইষ্টমন্ত্রে সিদ্ধিলাভ করেন রামদাস। লাভ করেন বিভিন্ন যোগবিভূতি। পরবর্তীতে সাক্ষাৎ তাঁর ইষ্টদেবতা প্রভু রামচন্দ্রের দর্শন পান একনিষ্ঠ সাধক রামদাস কাঠিয়াবাবা। স্থানটির নাম সয়লানী কা কুন্ডা। তাই ভক্তদের তিনি বলতেন, “রামদাস কো রাম মিলা, সয়লানী কা কুন্ডা,

সন্তন্ তো সচ্চি মানে, ঝুট্ মানে গুন্ডা!” আরও পরে বৈষ্ণবদের পরম স্থান ব্রজধাম বৃন্দাবনের প্রধান মোহন্ত হন তিনি। ততদিনে কত ভক্ত, শিষ্য এসে পড়েছেন তাঁর পবিত্র চরণতলে। তাঁর নির্দেশিত পথে হেঁটে চলেছে পরম পথের সাধনা। শোনা যায়, এদের মধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী তারাকিশোর চৌধুরির মতো দু একজনের কাছে সূক্ষ্ম দেহে উপস্থিত হয়ে তাদের দীক্ষা দেন রামদাস কাঠিয়াবাবা।

দিন এগিয়ে চলে। যার শুরু আছে তার শেষও আছে! এসে গেল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯০৯ সালে ১০৯ বছর বয়সে মহাসমাধিতে পরম ব্রহ্মে লীন হয়ে গেলেন রামদাস কাঠিয়াবাবা। আশ্রমে তাঁর নিত্যপুজো করা রাধা মাধবের চোখেও তখন জল!

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সাব এডিটর – অনুরাধা ভট্টাচার্য্য শর্মা, রামানন্দ দাস, প্রতীক চ্যাটার্জী

ম্যানেজার – বুবুন মাইতি

এডিটর – দিব্যেন্দু দাস

এডিটর ইন চিফ – রাকেশ শর্মা

Happy
Happy
1
Sad
Sad
0
Excited
Excited
0
Sleepy
Sleepy
0
Angry
Angry
0
Surprise
Surprise
0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *