” ঈশ্বর এক না একাধিক ”
✍🏾সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

তিনি যেমন ভাবে পাঠিয়েছেন ঠিক তেমন ভাবেই থেকে যাব প্রকৃতির কোলে। মুক্ত প্রকৃতির কোলে মুক্ত যোগী পুরুষ হয়ে। আর আকাশবৃত্তিই হবে জীবনধারণের একমাত্র উপায়। তাইতো তিনি থাকতেন সম্পূর্ণ নিরাবরণ অবস্থায়! পরনে একটুকরো সুতোও থাকত না। দীর্ঘকায় মহাযোগীর কন্ঠে শোভা পেত দীর্ঘ রুদ্রাক্ষের মালা। রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতে অবিচল। কখনো ভরা শীতে, হাড় কাঁপানো প্রবল ঠান্ডায় বারাণসীর গঙ্গায় ভেসে থাকতেন তো কখনো বা পড়ে থাকতেন কাঠফাটা রোদে, তেতে ওঠা বালিতে। কোনোও কিছুতেই বিকার ছিল না তাঁর! অন্যদিকে আকাশবৃত্তি স্বরূপ সামান্যতম সঞ্চয় না করে রেখে ভক্ত, দর্শনার্থীদের দেওয়া যৎসামান্য আহার্যবস্তু গ্রহণ। তিনি ভারতবিশ্রুত মহাসাধক, আত্মজ্ঞানের উত্তুঙ্গ শিখরে অবস্থান করা ত্রৈলঙ্গস্বামী।

অন্ধ্রপ্রদেশের ভিজিয়ানাগ্রামে জন্ম গ্রহণ করা শিবরাম তাঁর সন্ন্যাস জীবনে হলেন গণপতি সরস্বতী। তেলেঙ্গানা থেকে এসেছিলেন তাই ত্রৈলঙ্গস্বামী হিসাবেই সমধিক পরিচিতি লাভ করেন। বাহান্ন বছর বয়সে গৃহত্যাগ করে, প্রায় চুরাশি বছর বয়সে সাধনায় সিদ্ধিলাভের পর গুরুর নির্দেশে হিমালয় থেকে সমতলভূমিতে নেমে আসেন ত্রৈলঙ্গস্বামী। তখন তাঁর প্রায় একশো দশ বছর বয়স। দুশ আশি বছরের জীবনে শেষ কটি বছর কাটিয়েছেন মৌনী অবস্থায়। কোনোও কথা বলতেন না। ভক্তদের প্রশ্নের উত্তরে দেওয়ালে লিখে রাখা বাণী দেখিয়ে দিতেন। তাঁর দেখাশোনা করতেন মঙ্গল ভট্ট নামে এক পরম ভক্ত। বারাণসীর বিশ্বনাথ শিবকে চড়ানো ফুল, মালা কোন যাদুবলে শোভা পেত স্বামীজির মাথায়, গলায়! দেখে ধন্য হতেন ভক্তরা। তাঁকে কাশীক্ষেত্রের চলমান শিব হিসাবে অভিহিত করেন অসংখ্য ভক্ত।

এহেন চলমান শিবকে দর্শন করতে বারাণসীতে আসেন ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব। সঙ্গে রাণী রাসমণির জামাই মথুরা মোহন বিশ্বাস। সকলের সেজোবাবু। ঠাকুরের ইচ্ছা যে তাঁর জীবন্ত বিশ্বনাথকে ক্ষীর সেবা করাবেন। সেইমতো নিজ হাতে দুধ মেরে ক্ষীর তৈরি করে মথুরবাবুকে সঙ্গে করে স্বামীজির কাছে পৌঁছলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব। দেখা হলো দুই মহাযোগীর! মিললেন দুই যুগপুরুষ! আলতো হাওয়ায় মাথা নোয়ালেন আধ্যাত্মিক জগতের দুই মহীরুহ! কোনোও কথা হলো না দুজনের। আবার হলোও! ত্রৈলঙ্গস্বামীকে প্রশ্ন করলেন ঠাকুর। স্বামীজির দিকে একবার একটি, পরে দুটি আঙুল তুলে ইঙ্গিত করেন রামকৃষ্ণ। উত্তরে একটি আঙুল তুলে ধরেন ত্রৈলঙ্গস্বামী। অর্থাৎ কিনা- ‘ঈশ্বর এক না একাধিক?’ উত্তর- ‘এক!’ জাগতিকভাবে তিনি বহু। সমাধিতে সব এক! উত্তর পেয়ে খুশিতে ডগমগ রামকৃষ্ণদেব বলেন- এখানে লীলা দেখে যাওয়া হলো। আবার ‘সেখানে’ দেখা হবে! হাসিমুখে সম্মতি জানান ত্রৈলঙ্গস্বামী। তাই তো! তেতলার আলো, হাওয়ায় যাঁর বাস তিনি একতলার অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ঘরে আর কতদিন থাকবেন!
অসীম আকাশ মিলল দিকচক্রবালে মিশে যাওয়া অতলান্ত মহাসমুদ্রে। ঠিক যেমন জীবাত্মা মিলে যায় পরমাত্মায়! সেই মিলন দেখে আনন্দ সাগরে ভাসা যায় কিন্তু তাঁদের মধ্যে তুলনা চলে না!
সাব এডিটর – অনুরাধা ভট্টাচার্য্য শর্মা, রামানন্দ দাস, প্রতীক চ্যাটার্জী
ম্যানেজার – বুবুন মাইতি
এডিটর – দিব্যেন্দু দাস
এডিটর ইন চিফ – রাকেশ শর্মা
